প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
উন্নয়নের অবকাঠামো থেকে সামাজিক নিরাপত্তা—শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ মেয়াদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগের বিস্তৃত মূল্যায়ন
সৈয়দ উসামা , গণমাধ্যম কর্মী ||
বাংলাদেশ আওয়ামী বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মো. মিলন শেখ এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উসামা বিন শিহাব শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামোগত পরিবর্তন এবং সামাজিক কর্মসূচি নিয়ে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্যে দেশের যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্মীয় অবকাঠামো, শিল্পায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের সরকারি কর্মকাণ্ডের অন্যতম দৃশ্যমান ক্ষেত্র ছিল বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ। পদ্মা সেতু ও রেল সংযোগ, মেট্রোরেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, হাতিরঝিল প্রকল্প, পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়ক, বিভিন্ন ফ্লাইওভার ও উড়ালসেতু এবং যমুনা রেলসেতুর মতো প্রকল্প দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন।দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ সম্প্রসারণেও কর্ণফুলী টানেল, কক্সবাজার রেল সংযোগ, কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন, ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন মহাসড়ক চার, ছয় ও আট লেনে উন্নীত করার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং পর্যায়ক্রমে আরও জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনাকেও তারা দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখছেন।
বিদ্যুৎ খাতেও বড় পরিসরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে তারা উল্লেখ করেন। পায়রা, রামপাল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে তারা দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণকে বাংলাদেশের মহাকাশ ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল অন্যতম বড় উদ্যোগ। বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস কর্তৃপক্ষের (BEZA) পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্যের মধ্যে শিল্প, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়ানোর বিষয় ছিল।ধর্মীয় ও ইসলামী শিক্ষা অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। দেশজুড়ে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল; প্রকল্পটির আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এসব স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস বা তাকমিলকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিষয়ে মাস্টার্স সমমান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে এ বিষয়ে আইনি কাঠামোর অনুমোদনের উদ্যোগের কথা সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল।এ ছাড়া ১,৬৮১টি মাদ্রাসা ভবন নির্মাণের দাবিও সংগঠনটির পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে। এই সংখ্যাটি সরকারি প্রকল্প-নথি দিয়ে আলাদাভাবে যাচাই না করে প্রতিবেদনে সংগঠনটির দাবির হিসেবেই উল্লেখ করা সমীচীন।
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন সংগঠনটির নেতারা। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, শিক্ষা সহায়তা, জেলেদের খাদ্য সহায়তা, ভিজিডি, ভিজিএফ, ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো উদ্যোগকে তারা নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিস্তৃত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ, নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ চালু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও তাদের বক্তব্যে এসেছে। স্বাস্থ্য খাতে কমিউনিটি ক্লিনিক, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং বিভিন্ন চিকিৎসা অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগকে তারা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারও তাদের মূল্যায়নে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল তথ্যসেবা, মোবাইল ও ইন্টারনেটের বিস্তার, ডিজিটাল পাসপোর্ট, মোবাইল ব্যাংকিং এবং সরকারি সেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগকে তারা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের সহায়তা, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণের পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগের কথাও তারা তুলে ধরেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ও তাদের মূল্যায়নে রয়েছে।
মানবিক দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া। ২০১৭ সালের সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের আশ্রয়, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা দেওয়ার কাজে যুক্ত হয়। UNHCR-এর হিসাবে ২০১৭ সালের আগস্টের পর ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে এবং বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।
এ ছাড়া সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, ছিটমহল সমস্যার সমাধান, পায়রা সমুদ্রবন্দর, মেরিন ড্রাইভ, গ্রাম আদালত, বিভিন্ন আদালত ভবন, বিনোদনকেন্দ্র, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও সংগঠনটির নেতারা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
মো. মিলন শেখ ও সৈয়দ উসামা বিন শিহাবের বক্তব্য, তাদের সংগঠন শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার এসব উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি জনগণের সামনে তুলে ধরতে চায়। তবে প্রকল্পের সংখ্যা, ব্যয়, বাস্তবায়নের হার ও প্রত্যাশিত ফলাফল নিয়ে মূল্যায়ন করতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, প্রকল্প সমাপ্তির প্রতিবেদন এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে তাদের বক্তব্যে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা হলো—যোগাযোগ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিল্পায়ন, রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় অবকাঠামো, ডিজিটাল সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা—বিভিন্ন খাতে ধারাবাহিক সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কাঠামো সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়েছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব