প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
তিন দিন ধরে ঘুরছে স্কুলের ফ্যান, সরকারি বিদ্যুতের অপচয়—দায় নেবে কে
মোঃ রেজাউল করিম , সংবাদদাতা ||
সরকারি সম্পদের ব্যবহার ও সংরক্ষণে দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন যখন বারবার সামনে আসছে, তখন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের আহমদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটেছে তারই একটি চিত্র। অভিযোগ, বিদ্যালয় ছুটির পর শ্রেণিকক্ষের বৈদ্যুতিক ফ্যান বন্ধ করা হয়নি। ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় ছুটির পর থেকে ৩০ আগস্ট রবিবার রাত পর্যন্ত ফ্যানটি চলতে দেখা গেছে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ করা হয়েছে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ৩০ আগস্ট রবিবার রাত ১২টার দিকে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে বিদ্যালয়ের ভেতরে বৈদ্যুতিক ফ্যান চলমান অবস্থায় দেখা যায়। অর্থাৎ ওই সময়েও সরকারি বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ চালু ছিল এবং ফ্যান ঘুরছিল।২৬ আগস্ট বুধবার পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ছিল সাধারণ ছুটি। ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার থেকে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়। ওই দিন কার্যক্রম শেষে বিদ্যালয় ছুটির পর শ্রেণিকক্ষের ফ্যান বন্ধ করার কথা থাকলেও অভিযোগ, ফ্যানের সুইচ বন্ধ করা হয়নি। একই সঙ্গে জানালা যথাযথভাবে বন্ধ হয়নি, এরপর ২৮ ও ২৯ আগস্ট শুক্র ও শনিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। স্থানীয়দের দাবি, এই ছুটির সময়েও ফ্যানটি চলতে থাকে। ৩০ আগস্ট রবিবার রাত ১২টায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ সেই সময়ও ফ্যান চলার বিষয়টি দৃশ্যমানভাবে সামনে এনেছে।তিন দিন ধরে ফ্যান, দায়িত্বে ছিলেন কে।ঘটনাটি যদি স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু একটি ফ্যান বন্ধ না করার নয়। প্রশ্ন হলো: বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় ছুটির পর থেকে রবিবার রাত পর্যন্ত এত দীর্ঘ সময় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালু থাকার বিষয়টি কারও নজরে এলো না কেন।বিদ্যালয় ছুটির আগে শ্রেণিকক্ষ পরীক্ষা করার দায়িত্ব কার।ফ্যান, লাইটসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কে।বিদ্যালয় বন্ধ থাকার দুই দিনেও কেউ কি প্রতিষ্ঠানটি তদারকি করেননি।রবিবার বিদ্যালয় খোলার পরও যদি ফ্যানটি চলমান থাকে, তাহলে শিক্ষক-কর্মচারীদের কারও চোখে পড়েনি কেন।একটি সুইচ, কিন্তু প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় সম্পদের।একটি ফ্যানের সুইচ বন্ধ করা খুবই সাধারণ দায়িত্ব। অথচ সেই সামান্য দায়িত্ব পালনে অবহেলা হলে সরকারি বিদ্যুতের অপচয় ঘটে। অর্থের পরিমাণ হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু সরকারি সম্পদের প্রতি দায়িত্ববোধের ঘাটতি কোনোভাবেই ছোট বিষয় নয়।দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের সময় সাধারণ মানুষ যখন বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করছেন, তখন সরকারি একটি বিদ্যালয়ে দায়িত্বহীনতার কারণে বিদ্যুৎ অপচয়ের অভিযোগ আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।যে বিদ্যুতের বিল জনগণের অর্থে পরিশোধ করা হয়, সেই বিদ্যুৎ অপচয়ের দায় নেবে কে।সভাপতি-সম্পাদক কি শুধু পদেই।বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি- সাধারণ সম্পাদক সহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।একটি সরকারি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শুধু কাগজে-কলমে কমিটি থাকা বা পদধারীদের নাম প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় বাস্তব তদারকি থাকা প্রয়োজন।যদি সত্যিই বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার রাত পর্যন্ত ফ্যান চলতে থাকে, তাহলে পরিচালনা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কেউ বিষয়টি দেখলেন না কেন।শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব কোথায়।বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ বন্ধ করে যাওয়ার সময় ফ্যান-লাইট বন্ধ করা, দরজা-জানালা নিরাপদভাবে বন্ধ করা এবং প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে রেখে যাওয়ার বিষয়টি দায়িত্বশীলদের নজরে থাকার কথা।এ ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে স্পষ্ট জবাব চাওয়া স্বাভাবিক।কে শেষবার শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়েছেন।কে ফ্যানের সুইচ পরীক্ষা করেছেন।সুইচ বন্ধ না করেই যদি বিদ্যালয় ত্যাগ করা হয়ে থাকে, তার কারণ কী।শুক্র ও শনিবার বিদ্যালয় বন্ধ থাকার সময় ফ্যান চলার বিষয়টি কেউ জানতেন কি না।শিক্ষা অফিসের নজরদারিও কি প্রশ্নের বাইরে।কোনো সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ উঠলে শুধু একজন শিক্ষক বা কর্মচারীকে দায়ী করলেই বিষয়টি শেষ হয় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা দরকার।আহমদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন।তদন্তে দেখা যেতে পারে। ফ্যানটি কখন থেকে চালু ছিল।বিদ্যালয় ছুটির সময় কে দায়িত্বে ছিলেন।বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ করার কোনো নির্ধারিত দায়িত্ব ছিল কি না।বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব কী বলছে।দায়িত্বে অবহেলার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।ভিডিও ফুটেজে যা দেখা গেছে৩০ আগস্ট রবিবার রাত ১২টার দিকে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে বিদ্যালয়ের ভেতরে ফ্যান চলমান অবস্থায় দেখা যায়।এই ফুটেজ এখন ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে ২৭ আগস্ট থেকে ফ্যানটি একটানা চলেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ মিটার রিডিং, বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য, দায়িত্বপ্রাপ্তদের বক্তব্য এবং প্রয়োজনে সরেজমিন তদন্ত করা যেতে পারে।অর্থাৎ, ভিডিওতে রবিবার রাতের চিত্র নিশ্চিত হলেও বৃহস্পতিবার থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ফ্যান চলার বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে আরও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।দায় এড়ানোর সুযোগ আছে কি।সরকারি বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ, পানি, আসবাবপত্র কিংবা অন্য যেকোনো সম্পদ জনগণের অর্থে পরিচালিত। তাই দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ অবহেলা করলে সেটি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, সরকারি সম্পদের ক্ষতি।এখন প্রশ্ন:তিন দিন ধরে যদি ফ্যান চলেই থাকে, তাহলে দায় কার।ছুটির আগে সুইচ বন্ধ করার দায়িত্ব কার ছিল।বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তদারকি কোথায় ছিল।সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীরা কেন বিষয়টি দেখতে পেলেন না।উপজেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি কতটা কার্যকর।সরকারি বিদ্যুতের অপচয় হলে তার জবাবদিহি কে করবে।ছোট অবহেলা নয়, জবাবদিহির বড় পরীক্ষা।আহমদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি ফ্যান চলার ঘটনাটি হয়তো আর্থিক ক্ষতির হিসাবে সামান্য। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের মানদণ্ডের বিচারে এটি গুরুত্বপূর্ণ।সুইচ বন্ধ করার মতো একটি সাধারণ দায়িত্বও যদি যথাযথভাবে পালন না হয়, তাহলে সরকারি সম্পদ রক্ষায় বড় দায়িত্বগুলো কতটা সতর্কতার সঙ্গে পালন করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন উঠবেই।তাই বিষয়টি ধামাচাপা না দিয়ে ভিডিও ফুটেজ যাচাই, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ, প্রয়োজনে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব পরীক্ষা এবং দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।ফ্যান ঘুরছে, বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, বিল দিচ্ছে জনগণ। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দায়িত্বের এই খরচের হিসাব দেবে কে।৩০ আগস্ট রবিবার রাত ১২টার ভিডিও ফুটেজ আহমদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দায়িত্বশীলদের জন্য এখন একটি সরাসরি জবাবদিহির প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব