প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
'৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ও '২৪ এর ৩৬ জুলাই গণঅভ্যুত্থান '
মোঃ আমজাদ হোসাইন , সংবাদদাতা ||
★’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান★রক্ত, আত্মত্যাগ, অধিকার ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ-বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ ও ২০২৪—দুটি আলাদা সময়ের দুটি গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আর ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, বৈষম্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অধিকার ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়।দুটি ঘটনা এক নয়; তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, লক্ষ্য ও চরিত্র ভিন্ন। কিন্তু দুটির মাঝেই একটি গভীর মানবিক যোগসূত্র রয়েছে—অধিকার, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।’৭১: স্বাধীনতার জন্য এক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি।১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। শুরু হয় গণহত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন।এরপর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।’৭১-এর আত্মত্যাগের ব্যাপকতাবাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ও প্রচলিত জাতীয় বয়ানে মুক্তিযুদ্ধে—প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন,প্রায় ২ লাখ নারী ও কন্যাশিশু যৌন সহিংসতার শিকার হন,এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যাপক যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে সম্মানিত করা হয়েছে।এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অসমাপ্ত জীবন ও একটি জাতির বেদনা।’২৪: ছাত্র আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান২০২৪ সালের আন্দোলনের সূচনা হয় সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের দাবি বিস্তৃত হয়।জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের Fact-Finding Report বলছে, আন্দোলনের পেছনে শুধু কোটা ইস্যু নয়; দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, বৈষম্য, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে মানুষের অসন্তোষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।জুলাই ২০২৪-এ আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। সংঘর্ষ, গুলি, গ্রেপ্তার, সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ক্রমেই বাড়তে থাকে।জাতিসংঘের প্রাথমিক বিশ্লেষণে আগস্টের শুরুতেই বলা হয়েছিল যে হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে এবং হাসপাতালগুলো আহতদের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।’২৪-এর রক্তক্ষয়: প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুজাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর Fact-Finding Report বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রাণহানির একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক হিসাব দিয়েছে।জাতিসংঘের হিসাবে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। নিহতদের মধ্যে আনুমানিক ১২–১৩ শতাংশ শিশু ছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ আহত হন এবং নিহতদের বড় অংশ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।অর্থাৎ, ’২৪-এর আন্দোলনের ক্ষয়ক্ষতি শুধু মৃত্যুর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না।অনেকে—গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন;হাত-পা হারিয়েছেন;চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন;স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন;গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন;পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছেন;শিক্ষা ও কর্মজীবন থেকে ছিটকে পড়েছেন।জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শিশুদের নিহত ও আহত হওয়ার পাশাপাশি নারীদের বিরুদ্ধে শারীরিক হামলা, যৌন সহিংসতার হুমকি এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।৩০,০০০ আহত—সংখ্যার সঙ্গে আছে হাজারো পরিবারের কান্না২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় ৩০ হাজার। চোখের আঘাত ছিল ’২৪-এর অন্যতম ভয়াবহ মানবিক ক্ষতি। বাংলাদেশ সরকারের জাতিসংঘে দেওয়া ২০২৪ সালের বক্তব্যে তখন প্রায় ৪০০ জনের চোখে গুরুতর আঘাত এবং ৩৫ জনের উভয় চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।এগুলো কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিসংখ্যান নয়—এগুলো এমন মানুষের গল্প, যারা হয়তো সারাজীবন আলো দেখতে পারবেন না।’৭১-এর ৩০ লাখ বনাম ’২৪-এর ১,৪০০—তুলনা কি করা যায়?এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার।সংখ্যার তুলনা করে ’৭১ বা ’২৪-এর গুরুত্ব নির্ধারণ করা উচিত নয়।কারণ ’৭১ ছিল একটি স্বাধীনতা ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, যেখানে নয় মাস ধরে যুদ্ধ, গণহত্যা, বাস্তুচ্যুতি ও ব্যাপক যৌন সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল।অন্যদিকে ’২৪ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত একটি ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান, যার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল বৈষম্য, অধিকার, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।তাই বলা যায়—’৭১ আমাদের দিয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র।’২৪ স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।’৭১-এর শহিদ এবং ’২৪-এর শহিদ দুজনকেই সম্মান করার শিক্ষা-একটি জাতির ইতিহাসে কোনো প্রাণের মূল্য কেবল সংখ্যায় মাপা যায় না।৩০ লাখ হোক, ১,৪০০ হোক —প্রতিটি প্রাণের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার।একজন বাবা হারিয়েছেন সন্তানকে।একজন মা হারিয়েছেন সন্তানকে।একজন স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামীকে।একজন সন্তান হারিয়েছে তার বাবা বা মাকে।তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার এবং ভুক্তভোগীদের মর্যাদা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।জাতিসংঘও ২০২৪ সালের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে সত্য উদঘাটন, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।ইতিহাস যেন প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়’৭১-এর ইতিহাস আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি।আর ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা।কোনোটিকেই দলীয় সংকীর্ণতার মধ্যে বন্দী করা উচিত নয়।মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়—এটি বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাস।একইভাবে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকেও কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পূর্ণতা নষ্ট হবে।ইতিহাসের সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন—তথ্য, দলিল, সাক্ষ্য, গবেষণা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান।আমাদের করণীয় কী?১৯৭১-এর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে শুধু স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়া নয়।এর অর্থ—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা।বৈষম্য দূর করা।আইনের শাসন নিশ্চিত করা।দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা।ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় রাখা।আর ’২৪-এর শহিদ ও আহতদের প্রতি সম্মান জানানো মানে তাদের রক্তকে রাজনৈতিক স্লোগানে ব্যবহার না করে একটি অধিকতর মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করা।শেষ কথা১৯৭১ আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি জাতি ঐক্যবদ্ধ হলে ইতিহাস বদলে দিতে পারে।২০২৪ আমাদের আবার মনে করিয়ে দিয়েছে—স্বাধীনতার পরও ন্যায়বিচার, অধিকার, সমতা ও জবাবদিহির সংগ্রাম শেষ হয়ে যায় না।তাই ’৭১-এর ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, ২ লাখ বীরাঙ্গনার অশ্রু এবং ’২৪-এর প্রায় ১,৪০০ মানুষের আত্মত্যাগ—সবকিছুর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা,যেখানে কোনো মানুষ অন্যায়ের কারণে জীবন হারাবে না,কোনো মা সন্তানের লাশ কাঁধে নেবেন না,কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হবেন না,কোনো শিশু রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হবে না,কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অধিকার হারাবে না,এবং রাষ্ট্র হবে জনগণের—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়।’৭১-এর স্বাধীনতা হোক আমাদের অহংকার,’২৪-এর আত্মত্যাগ হোক আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা,আর ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হোক ন্যায়, মানবিকতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের বাংলাদেশ।শ্রদ্ধা ’৭১-এর সকল শহীদের প্রতি।শ্রদ্ধা ’২৪-এর সকল শহীদ ও আহতের প্রতি।দোয়া করি—আল্লাহ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে শান্তি, ন্যায় ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করুন। আমিন।তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর (OHCHR), United Nations in Bangladesh এবং বাংলাদেশের সরকারি নথি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রকাশনা।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব