প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একজন স্পেন প্রবাসী বাংলাদেশী তরুনে করুন কাহিনী
আমজাদ হোসেন, সংবাদদাতা ||
‘আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে’মৃত্যুর আগে আলিফের শেষ আকুতিকিছু কিছু মৃত্যু শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, সঙ্গে নিয়ে যায় একটি পরিবারের অসংখ্য স্বপ্ন।ইউসুফ হাসান আলিফের মৃত্যুও তেমনই এক মৃত্যু।গাজীপুরের কাপাসিয়ার তরুণ আলিফের বয়স মাত্র ২৬/২৭ বছর। ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর আশায় কিছুদিন আগেই পাড়ি জমিয়েছিলেন স্পেনে। নতুন দেশ, নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন। হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, কঠিন দিনগুলো পার করে একদিন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। নিজের জীবনটাও একটু গুছিয়ে নেবেন।কিন্তু সেই স্বপ্নের শহর মাদ্রিদেই থেমে গেল তার জীবন।গত ৩০ আগস্ট সন্ধ্যায় স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের আরগানজুয়েলা জেলার কাইয়ে কানারিয়াস এলাকার একটি ভূগর্ভস্থ গ্যারেজে ভয়াবহ আগুন লাগে। সেখানে বিভিন্ন মালামালের পাশাপাশি রাখা ছিল বৈদ্যুতিক বাইসাইকেল, যার অনেকগুলো ফুড ডেলিভারির কাজে ব্যবহৃত হতো।প্রতিদিনের মতো কাজের জন্য সাইকেল নিতে সেখানে গিয়েছিলেন আলিফ।হঠাৎ আগুন।মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ ভরে যায় ধোঁয়া আর তীব্র উত্তাপে। বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চারদিকে যখন শুধু ধোঁয়া আর আগুন, তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকা আলিফ সহকর্মীদের কাছে শেষবারের মতো আকুতি জানিয়েছিলেন,‘আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।’ভাবুন তো, সেই মুহূর্তটা কেমন ছিল?একজন ২৬/২৭ বছরের তরুণ। চোখের সামনে হয়তো ভেসে উঠছিল বাবা-মায়ের মুখ। মনে পড়ছিল আপনজনদের কথা। হয়তো ভাবছিলেন, ‘আমি কি আর এখান থেকে বের হতে পারব?’কিন্তু পারেননি।মাদ্রিদ ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার অভিযান শুরু করে। গ্যারেজটি ছিল জটিল ও গোলকধাঁধার মতো। প্রচণ্ড তাপ ও বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে উদ্ধারকারীদেরও ভেতরে প্রবেশ করতে প্রচণ্ড ঝুঁকি নিতে হয়।একপর্যায়ে একটি কক্ষ থেকে আলিফকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।ধোঁয়ায় বিষক্রিয়া ও শ্বাসনালিতে পোড়া ক্ষতের কারণে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।যে তরুণ মাত্র দুই দিন আগে কাজের অনুমতি পেয়েছিলেন, সেই তরুণই আর দুই দিন পর পৃথিবীর আলো দেখতে পারলেন না।কী নির্মম পরিহাস!হয়তো কাজের অনুমতি পাওয়ার পর আলিফের মনে নতুন করে স্বপ্ন জন্মেছিল। হয়তো মাকে বলেছিলেন, ‘এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’হয়তো বাবার জন্য কিছু করার পরিকল্পনা করেছিলেন।হয়তো নিজের জন্যও ছোট্ট কোনো স্বপ্ন ছিল।কিন্তু প্রবাসের মাটিতে সেই স্বপ্নগুলো এখন পড়ে রইল একটি ভূগর্ভস্থ গ্যারেজের ধোঁয়ার মধ্যে।গাজীপুরের কাপাসিয়ার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুনের সন্তান ইউসুফ হাসান আলিফ আর কোনোদিন মায়ের কাছে ফিরবেন না। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলবেন না, ‘আমি ভালো আছি।’ফিরবে শুধু তার নিথর দেহ।আর বাড়ির দরজায় হয়তো প্রতিদিন অপেক্ষা করবে একটি মা। ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকবে পরিবার। হয়তো মনে হবে, এই বুঝি আলিফ ফোন করে বলবে, ‘মা, আমি ভালো আছি।’কিন্তু সেই ফোন আর আসবে না।প্রবাসে থাকা মানুষগুলোকে আমরা অনেক সময় শুধু ‘প্রবাসী’ বলে দেখি। কিন্তু একজন প্রবাসী মানে শুধু বিদেশে কাজ করা একজন মানুষ নন।তিনি কারও সন্তান।কারও ভাই।কারও স্বামী।কারও বাবা।কোনো একটি পরিবারের শেষ আশ্রয়।তাদের ঘামের প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে মিশে থাকে পরিবারের স্বপ্ন। আর তাদের প্রতিটি কর্মদিবসের পেছনে থাকে ফিরে আসার একটি প্রতিশ্রুতি।আলিফও হয়তো ফিরতে চেয়েছিলেন।কিন্তু ফিরলেন না।তার শেষ কথাগুলো এখনো যেন সেই গ্যারেজের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,‘আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।’কত অসহায় ছিল সেই কয়েকটি শব্দ!একজন তরুণ বাঁচতে চেয়েছিলেন। শুধু একটু বাতাস চেয়েছিলেন। একটু সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সাহায্য তার কাছে পৌঁছায়নি।আলিফের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিদেশের মাটিতে জীবন গড়তে যাওয়া হাজারো বাংলাদেশির জীবন কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটে।আল্লাহ ইউসুফ হাসান আলিফকে ক্ষমা করুন। তার কবরকে শান্তিতে ভরে দিন এবং শোকসন্তপ্ত বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের এই অসহনীয় কষ্ট সহ্য করার শক্তি দিন।কিছু স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য মানুষ বিদেশে যায়।কিছু স্বপ্ন আর কোনোদিন পূরণ হয় না।আলিফের স্বপ্নটাও তেমনই একটি অসমাপ্ত গল্প হয়ে রইল।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব