প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কেমন পিতা-মাতা আপনি?
কায়েস মাহমুদ ||
একটি সুস্থ, সুন্দর ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হলো সঠিক parenting বা ইতিবাচক অভিভাবকত্ব। একটি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি তার মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশ অনেকটাই নির্ভর করে পারিবারিক পরিবেশ এবং পিতা-মাতার পরিচর্যার ওপর। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সন্তান লালন-পালন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে, আর এই প্রেক্ষাপটে সচেতন অভিভাবকত্বের কোনো বিকল্প নেই।অভিভাবকত্বের মূল নীতিসমূহধারাবাহিক আবেগিক উপস্থিতি: সুস্থ সংযুক্তি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে শিশুদের আবেগিক প্রয়োজনের প্রতি বিশ্বস্তভাবে সাড়া দিন এবং তাদের অনুভূতিকে বিচার না করে মূল্যায়ন করুন।শর্তহীন গ্রহণযোগ্যতা: সন্তানের অন্তর্নিহিত মূল্য বা ভালোবাসাকে তাদের দৈনন্দিন পারফরম্যান্স, একাডেমিক গ্রেড বা ভুলত্রুটি থেকে আলাদা রাখুন; সন্তান যেন বিশ্বাস করে যে সে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিরাপদ।সঠিক শৃঙ্খলার রূপকার: শাসন মানে কেবল কঠোরতা বা ভয় দেখানো নয়; বরং নিয়মের পেছনের কারণ বুঝিয়ে দেওয়া এবং তাদের ভুল থেকে নিজে নিজে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ (যৌক্তিক পরিণতি) তৈরি করে দেওয়া।রোল মডেল বা আদর্শ: শিশুরা উপদেশ শোনার চেয়ে বড়দের আচরণ বেশি অনুকরণ করে। তাই নিজেদের আচরণ, কথা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে সন্তানের সামনে সঠিক জীবনযাপনের উদাহরণ তৈরি করুন।হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য ইমাম (নেতা) বানান।" (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪)সন্তানকে কুসংস্কার ও শিরক থেকে দূরে রাখার উপদেশ: "আর স্মরণ করুন, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে শরিক করো না। নিশ্চয় শিরক হলো বড় জুলুম।’" (সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩)"আর স্মরণ করুন, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে শরিক করো না। নিশ্চয় শিরক হলো বড় জুলুম।’" (সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩)সন্তানকে সালাত, সৎ কাজ ও ধৈর্যের শিক্ষা দেওয়া: "হে আমার বৎস! সালাত কায়েম করো, ভালো কাজের নির্দেশ দাও, মন্দ কাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যা ঘটে তাতে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয় এটি সাহসিকতার কাজ।" (সূরা লুকমান, আয়াত: ১৭)"হে আমার বৎস! সালাত কায়েম করো, ভালো কাজের নির্দেশ দাও, মন্দ কাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যা ঘটে তাতে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয় এটি সাহসিকতার কাজ।" (সূরা লুকমান, আয়াত: ১৭)সন্তান হত্যা বা رزق (রিযিক)-এর ভয়ে উদ্বেগ প্রকাশ না করা: "দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না; আমিই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদের হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।" (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩১)"দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না; আমিই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদের হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।" (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩১)প্রত্যেক অভিভাবক তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে... পিতা তার পরিবারের ওপর দায়িত্বশীল এবং তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে... পিতা তার পরিবারের ওপর দায়িত্বশীল এবং তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)সন্তানের প্রতি উত্তম আচরণ ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া: হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা তোমাদের সন্তানদের সম্মান করো এবং তাদের সুন্দর আচরণ বা শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।" (ইবনু মাজাহ)হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা তোমাদের সন্তানদের সম্মান করো এবং তাদের সুন্দর আচরণ বা শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।" (ইবনু মাজাহ)কন্যা সন্তানের লালন-পালনের বিশেষ মর্যাদা: হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমার কাছে এক নারী তার দুই কন্যাকে নিয়ে ভিক্ষা করতে এল। আমি তাকে তিনটি খেজুর দিলাম... সে একটি করে তার দুই কন্যাকে খাওলাল এবং অপরটি মুখে দিতে গিয়েও দিল না, বরং ভেঙে দুই টুকরো করে তাদের দুজনকে দিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) এলে আমি তাকে ঘটনাটি জানালাম। তখন তিনি বললেন, 'যাকে এই কন্যা সন্তানদের কোনো কিছু দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, আর সে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, তবে এই কন্যাসন্তানগুলো তার জন্য জাহান্নাম থেকে আলের (বাঁধের) ব্যবস্থা হবে।' (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমার কাছে এক নারী তার দুই কন্যাকে নিয়ে ভিক্ষা করতে এল। আমি তাকে তিনটি খেজুর দিলাম... সে একটি করে তার দুই কন্যাকে খাওলাল এবং অপরটি মুখে দিতে গিয়েও দিল না, বরং ভেঙে দুই টুকরো করে তাদের দুজনকে দিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) এলে আমি তাকে ঘটনাটি জানালাম। তখন তিনি বললেন, 'যাকে এই কন্যা সন্তানদের কোনো কিছু দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, আর সে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, তবে এই কন্যাসন্তানগুলো তার জন্য জাহান্নাম থেকে আলের (বাঁধের) ব্যবস্থা হবে।' (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)সন্তানকে উপহার ও দানে সমতা বজায় রাখা: হজরত নুমান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, "তোমরা সন্তানদের মধ্যে উপহার বা দানে ইনসাফ করো, তোমরা সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)হজরত নুমান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, "তোমরা সন্তানদের মধ্যে উপহার বা দানে ইনসাফ করো, তোমরা সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)পিতা-মাতার করণীয় ও বর্জনীয় নির্দেশিকাসন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং মতামতকে গুরুত্ব দেওয়াঅন্য শিশুর সাথে তুলনা করে সন্তানের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করাপড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করানিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন বা অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ শিশুর মনে চাপিয়ে দেওয়ানির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা (ঘুম, খাওয়া ও পড়াশোনা)মাত্রাতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম বা ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হতে দেওয়াভুল করলে রাগের বদলে শান্তভাবে ডেকে বুঝিয়ে বলাসবার সামনে বা জনসমক্ষে তিরস্কার বা অপমান করাবিকাশ ও সহায়ক পরিবেশ গঠনের পদক্ষেপগুণগত সময় বা কোয়ালিটি টাইম: সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝেও নির্দিষ্ট কিছু সময় রাখুন, যা কেবল সন্তানের সাথে খোশগল্পে, বই পড়ে বা খেলাধুলায় কাটবে।স্বাধীনতার সঠিক ভারসাম্য: অতি-সুরক্ষা বা সব কিছুতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলুন; বরং বয়স অনুযায়ী ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন।ইতিবাচক উৎসাহ: ছোটখাটো ভালো কাজের জন্যও প্রশংসা করুন, যাতে ইতিবাচক আচরণ ও সততার চর্চা দৃঢ় হয়।সন্তান কোনো প্রতিযোগিতার ট্রফি বা অর্জনের মাধ্যম নয়; সে একটি স্বাধীন প্রাণ, যার নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে। পিতা-মাতা যদি শাসকের পরিবর্তে একজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু, নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং সঠিক পথপ্রদর্শক হতে পারেন, তবেই একটি আত্মবিশ্বাসী, মানবিক এবং সুস্থ মানসিকতার প্রজন্ম গড়ে ওঠা সম্ভব।সম্পাদকীয়-কায়েস মাহমুদ-সম্পাদক ও প্রকাশ-জিএনএন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব