প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মসজিদ-মাদ্রাসার নামে সরকারি জমি দখল—পতিত জায়গা দখল দিতে টাকা
মোঃ রেজাউল করিম , সংবাদদাতা ||
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার আমদাবাদ ও হাসারচর এলাকার বিশাল সরকারি পতিত জায়গা ক্রমেই দখল হয়ে যাচ্ছে। এমন অভিযোগ উঠেছে। একসময় যে জায়গাটি দুই গ্রামের মানুষের যৌথ ব্যবহারের খেলার মাঠ, কৃষকদের কাজে ব্যবহৃত স্থান এবং গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন ঘরবাড়ি নির্মাণ করে নতুন বসতি গড়ে ওঠার অভিযোগ পাওয়া গেছে।স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঠটি শুধু একটি খেলার জায়গা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলাকার পুরোনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। একসময় এখানে ফুটবল খেলার পাশাপাশি ঘোড়দৌড় ও ষাঁড়ের লড়াইয়ের মতো আয়োজনও হতো। দুই গ্রামের যুবকদের খেলাধুলা, কৃষকদের ধান শুকানো এবং গরুর ঘাস খাওয়ানোর জন্যও জায়গাটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ধীরে ধীরে সেই সরকারি জায়গাই চলে যাচ্ছে ব্যক্তি দখলে। কোথাও ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে, কোথাও মাটি ফেলে জায়গা ভরাট করা হচ্ছে। আবার কোথাও সরকারি জায়গা থেকে মাটি কেটে জমি তৈরির অভিযোগ রয়েছে।মসজিদের নামে জায়গা, বিনিময়ে টাকা।সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মসজিদের নামে সরকারি জায়গা দখল দেওয়া নিয়ে।স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, অসহায়ত্বের কথা বলে এবং মসজিদে টাকা দেওয়ার কথা বলে সরকারি পতিত জায়গা দখলে দেওয়ার জন্য অর্থ নেওয়া হয়েছে। তবে ওই অর্থ বাস্তবে মসজিদের তহবিলে জমা হয়েছে কি না, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব স্থানীয় অভিযোগকারীরা দেখতে পাননি বলে দাবি করেছেন।একজন দখলদার, নাম পিয়ারা বেগম, জানিয়েছেন, সরকারি জায়গায় দখল নেওয়ার জন্য তিনি নুর ইসলামকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। নুর ইসলাম ওই টাকা মসজিদে দেবেন বলে তাকে জানিয়েছিলেন। তবে টাকা মসজিদে জমা হয়েছে কি না, তা তিনি জানেন না বলে জানান।আরেক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বন্দোবস্ত করে দেওয়ার কথা বলে নুর ইসলাম তার কাছ থেকেও ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এইরকম আট দশটি ফ্যামিলীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।মাদ্রাসার নামেও সরকারি জায়গা ভরাটের অভিযোগ।শুধু বসতঘর নয়, মাদ্রাসা করার জন্যও সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো বৈধ কাগজপত্র বা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই জায়গায় মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে।এমনকি মসজিদের নাম ব্যবহার করে সরকারি জায়গা থেকে মাটি খনন করে জায়গা তৈরির অভিযোগও রয়েছে।প্রশ্ন হলো: কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্দেশ্য থাকলেই কি সরকারি জমিতে অনুমতি ছাড়া মাটি ফেলে ভরাট বা মাটি কেটে নেওয়ার বৈধতা তৈরি হয়।মাটি কেটে বিক্রি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান।স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি জায়গা থেকে মাটি উত্তোলন করে বিক্রির অভিযোগে গত বছরের ৬ এপ্রিল শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করা হয়।স্থানীয়দের দাবি, ওই অভিযানে চারজনকে এক মাসের কারাদণ্ড এবং নুর ইসলামকে দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।সবকিছুর পেছনে নুর ইসলাম স্থানীয়দের অভিযোগ।সরকারি জায়গা দখল, মসজিদের নামে টাকা নেওয়া, মাদ্রাসার জন্য জায়গা ভরাট এবং সরকারি জায়গা থেকে মাটি উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ডের পেছনে নুর ইসলামের নির্দেশনা বা ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের একটি অংশ।নুর ইসলাম আমদাবাদ মসজিদের মুতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।আমদাবাদ মৌজার জায়গায় কেউ প্রতিবাদ করতে পারবে না দাবি স্থানীয়দের।অভিযোগ, নুর ইসলাম এমন অবস্থান নিয়েছেন যে আমদাবাদ মৌজার পতিত জায়গা দখল বা সেখানে কোনো স্থাপনা করা হলে অন্য কারও প্রতিবাদ করার অধিকার নেই।কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন: সরকারি জমি কোনো ব্যক্তি বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আমদাবাদ ও হাসারচর এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক অধিকার ও জনস্বার্থের বিষয়টি প্রশাসন কীভাবে দেখছে।স্থানীয়দের ভাষ্য, হাসারচর ও আমদাবাদ একই ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এবং দুই গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই মাঠটি ব্যবহার করে আসছেন। তাই শুধু মৌজার নাম দেখিয়ে এককভাবে জায়গাটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে সেটিও প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।জনপ্রতিনিধিরাও নাকি অবগত নন।স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি জায়গা দখলের এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সদস্য, চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি।যদি সত্যিই সরকারি জায়গায় মাদ্রাসা বানানোর উদ্যোগ। বসতঘর নির্মাণ করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে এসব করা হয়েছে।কোনো অনুমোদন না থাকলে এতদিন ধরে সরকারি জায়গায় মাটি ভরাট, মাটি উত্তোলন ও স্থাপনা নির্মাণ কীভাবে চলল, এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।মসজিদের অর্থের হিসাব কোথায়।আমদাবাদ গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার আরও অভিযোগ, নুর ইসলাম মসজিদটি অনেকটা এককভাবে পরিচালনা করছেন এবং মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব সাধারণ মুসল্লি বা স্থানীয়দের সামনে উপস্থাপন করা হয় না।কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, কোন খাতে নেওয়া হয়েছে এবং সেই অর্থ মসজিদের হিসাবে জমা হয়েছে কি না। এসব বিষয়ে স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।এ অভিযোগ সত্য হলে মসজিদের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। তবে এ অভিযোগেরও নথিপত্র ও মসজিদ কমিটির বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন।আইন কী বলে।সরকারি খাস জমি ব্যক্তিগতভাবে দখল করে রাখা বা নিজের ইচ্ছামতো অন্যকে দখল দেওয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে অত্যন্ত গুরুতর। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালে সরকারি খাস জমির অবৈধ দখল রোধের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এমনকি সরকারি খাস জমি অবৈধ দখলে রেখে বন্দোবস্তের আবেদন করা হলে দখল কালেক্টরের অনুকূলে হস্তান্তরের নির্দেশনার কথাও ম্যানুয়ালে উল্লেখ আছে।অর্থাৎ মসজিদ, মাদ্রাসা বা অন্য কোনো ভালো কাজের উদ্দেশ্য দেখালেই সরকারি জমি ব্যক্তিগতভাবে দখল বা কাউকে দখল দেওয়ার বৈধতা তৈরি হয় না। জমিটির প্রকৃতি, খতিয়ান, সরকারি মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন।ইসলামের দৃষ্টিতেও কি এমন দখল বৈধ।ইসলামে মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ। কিন্তু মহৎ উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে অন্যের হক বা সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া বৈধ হয়ে যায় না।সহিহ বুখারির ২৪৫২ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও জমির সামান্য অংশও দখল করে, কিয়ামতের দিন তার জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।আরেক বর্ণনায় জমি অন্যায়ভাবে নেওয়ার বিষয়ে আরও কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। সহিহ বুখারি ২৪৫৪।তাই সরকারি জায়গা অনুমোদন ছাড়া দখল করে সেখানে মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণকে শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে বৈধ দাবি করা যায় না। বরং সরকারি সম্পত্তির মালিকানা ও জনস্বার্থ রক্ষা এবং বৈধ অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করাই জরুরি।এখন বড় প্রশ্ন।১. আমদাবাদ-হাসারচরের বিশাল জায়গাটি আসলে কোন খতিয়ানে, কার মালিকানায় এবং কী শ্রেণির জমি।২. সরকারি জায়গায় ঘরবাড়ি নির্মাণের অনুমতি কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে।৩. মসজিদের নামে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়ার কোনো রসিদ বা হিসাব আছে কি।৪. নুর ইসলাম টাকা নিয়ে থাকলে তা মসজিদের হিসাবে জমা হয়েছে কি না।৫. মাদ্রাসার জন্য সরকারি জায়গা ভরাটের অনুমোদন দিয়েছে কোন কর্তৃপক্ষ।৬. সরকারি জায়গা থেকে মাটি উত্তোলন ও বিক্রির অনুমতি কার ছিল।৭. গত বছরের ৬ এপ্রিলের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে আসলে কী মামলা ও কোন আইনের ধারায় দণ্ড দেওয়া হয়েছিল।৮. আগের অভিযানের পরও সরকারি জায়গায় দখল কেন বন্ধ হয়নি।৯. সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান ও প্রশাসনকে না জানিয়ে সরকারি জায়গায় এসব কর্মকাণ্ড কীভাবে চলল।১০. ঐতিহ্যবাহী এই মাঠটি দখলমুক্ত করে দুই গ্রামের মানুষের খেলাধুলা ও জনস্বার্থে সংরক্ষণের উদ্যোগ কবে নেওয়া হবে।নুর ইসলামের বক্তব্য।অভিযোগের বিষয়ে নুর ইসলামের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, পুরো বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসের সরেজমিন তদন্ত, সরকারি রেকর্ড যাচাই, অবৈধ দখলের সীমানা নির্ধারণ এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে দুই গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠটি দখলমুক্ত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব