প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Benign Prostatic HyperplasiaBPH
মোঃ আমজাদ হোসাইন , সংবাদদাতা ||
Benign prostatic Hyperplasia------------------------প্রোস্টেট বড় হওয়া বা BPH: নীরব সমস্যাকে অবহেলা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাপ্রোস্টেট বড় হওয়া বা BPH: নীরব সমস্যাকে অবহেলা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাপুরুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এর মধ্যে একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বেনাইন প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া (BPH) নামে পরিচিত।অনেকেই প্রস্রাবের সমস্যাকে বয়সজনিত স্বাভাবিক বিষয় মনে করে দীর্ঘদিন অবহেলা করেন। কিন্তু বারবার প্রস্রাব হওয়া, রাতে ঘন ঘন ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাওয়া, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা প্রস্রাব পুরোপুরি না হওয়া—এসব হতে পারে প্রোস্টেটজনিত সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।প্রোস্টেট কী এবং এর কাজ কী?প্রোস্টেট হলো পুরুষের প্রজননতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। এটি সাধারণত আখরোটের মতো আকারের এবং মূত্রাশয়ের ঠিক নিচে অবস্থান করে। মূত্রনালির একটি অংশ প্রোস্টেটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।প্রোস্টেট বীর্যের একটি অংশ হিসেবে বিশেষ তরল তৈরি করে, যা শুক্রাণুর স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও চলাচলে সহায়তা করে। অর্থাৎ, পুরুষের প্রজনন ব্যবস্থায় প্রোস্টেটের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ছোট গ্রন্থিটিই কখনো কখনো বড় হয়ে মূত্রনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তখনই শুরু হয় প্রস্রাবের নানা সমস্যা।BPH কী?BPH বা Benign Prostatic Hyperplasia হলো প্রোস্টেট গ্রন্থির অ-ক্যান্সারজনিত বৃদ্ধি।এটি বিশেষ করে মধ্য ও বৃদ্ধ বয়সী পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। প্রোস্টেট বড় হয়ে মূত্রনালিকে সংকুচিত করলে প্রস্রাব বের হতে বাধাগ্রস্ত হয়।তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—BPH ক্যান্সার নয় এবং BPH থাকলেই প্রোস্টেট ক্যান্সার হবে—এমন কোনো কথা নেই।যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়প্রোস্টেট বড় হওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে—🔹 প্রস্রাব শুরু করতে সময় লাগা🔹 প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া🔹 ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব হওয়া🔹 প্রস্রাবের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হওয়া🔹 বারবার প্রস্রাবের বেগ অনুভব করা🔹 রাতে একাধিকবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম থেকে ওঠা🔹 হঠাৎ তীব্র প্রস্রাবের চাপ অনুভব করা🔹 প্রস্রাব করার পরও মনে হওয়া যে মূত্রাশয় পুরোপুরি খালি হয়নি🔹 গুরুতর অবস্থায় সম্পূর্ণভাবে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়াএসব লক্ষণ দেখা দিলে লজ্জা বা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।কেন প্রোস্টেট বড় হয়?BPH হওয়ার একক কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই। তবে এটি মূলত বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত।বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে এবং প্রোস্টেট গ্রন্থির আকারও বৃদ্ধি পেতে পারে। পারিবারিক ইতিহাস, স্থূলতা এবং কিছু জীবনযাপনগত বিষয়ও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।প্রোস্টেটাইটিস: প্রোস্টেটের প্রদাহপ্রোস্টেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো প্রোস্টেটাইটিস, অর্থাৎ প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ।এতে দেখা দিতে পারে—🔸 প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া🔸 তলপেট বা পেলভিসে ব্যথা🔸 কোমরের নিচের অংশে অস্বস্তি🔸 ঘন ঘন প্রস্রাব🔸 প্রস্রাবের সময় ব্যথা🔸 কিছু ক্ষেত্রে জ্বর ও কাঁপুনিকখনো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে এটি হতে পারে। আবার কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক ব্যথার কারণ সবসময় নির্দিষ্ট সংক্রমণ নাও হতে পারে।তাই নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।প্রোস্টেট ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতাপ্রোস্টেট ক্যান্সার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—প্রস্রাবের সমস্যা হলেই প্রোস্টেট ক্যান্সার হয়েছে—এমনটি নয়।BPH, সংক্রমণ, প্রদাহসহ বিভিন্ন কারণে প্রস্রাবের সমস্যা হতে পারে। তাই সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।PSA পরীক্ষা: একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, তবে একমাত্র নয়প্রোস্টেটের সমস্যা মূল্যায়নের জন্য চিকিৎসক PSA (Prostate-Specific Antigen) রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।তবে PSA বেড়ে গেলেই যে প্রোস্টেট ক্যান্সার হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। BPH বা প্রোস্টেটের প্রদাহসহ অন্যান্য কারণেও PSA বাড়তে পারে।আবার PSA পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক হলেও ব্যক্তিভেদে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।প্রয়োজনে চিকিৎসক অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন, যেমন—✔ শারীরিক পরীক্ষা✔ PSA পরীক্ষা✔ আল্ট্রাসনোগ্রাফি✔ প্রস্রাবের প্রবাহ পরীক্ষা✔ মূত্রাশয়ে অবশিষ্ট প্রস্রাবের পরিমাণ নির্ণয়✔ MRI✔ প্রয়োজন হলে বায়োপসিBPH-এর প্রতিকার ও চিকিৎসাBPH-এর চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর উপসর্গের তীব্রতা ও শারীরিক অবস্থার ওপর।জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন✔ রাতে ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত তরল পান না করা✔ ঘুমানোর আগে প্রস্রাব করে নেওয়া✔ অতিরিক্ত চা ও কফি সীমিত করা✔ দীর্ঘ সময় প্রস্রাবের বেগ চেপে না রাখা✔ নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা✔ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ না করাতবে শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়—এমনভাবে পানি কমিয়ে দেওয়া উচিত নয়।ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসাউপসর্গের তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসক এমন কিছু ওষুধ দিতে পারেন, যা প্রস্রাবের প্রবাহ সহজ করতে বা প্রোস্টেটের আকার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।অস্ত্রোপচার ও আধুনিক চিকিৎসাওষুধে পর্যাপ্ত উপকার না হলে অথবা প্রস্রাব সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া, বারবার সংক্রমণ, পাথর বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে অস্ত্রোপচার বা আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজন হতে পারে।চিকিৎসার ধরন রোগীর অবস্থা ও প্রোস্টেটের আকারের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়।কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?নিচের কোনো সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত—🚨 হঠাৎ সম্পূর্ণ প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া🚨 জ্বর ও কাঁপুনির সঙ্গে প্রস্রাবের সমস্যা🚨 প্রস্রাবে রক্ত দেখা🚨 তীব্র তলপেটের ব্যথা🚨 বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ🚨 প্রস্রাবের সমস্যার সঙ্গে কিডনির জটিলতার লক্ষণসচেতনতাই হতে পারে সুস্থতার প্রথম পদক্ষেপপ্রোস্টেট কোনো শত্রু নয়। এটি পুরুষ শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। কিন্তু বয়স বৃদ্ধি, প্রদাহ বা অন্যান্য রোগের কারণে প্রোস্টেটে সমস্যা দেখা দিলে তা অবহেলা করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।BPH একটি সাধারণ এবং চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ, সঠিক পরীক্ষা ও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী ভালো থাকতে পারেন।তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্রাবের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিলে লজ্জা, ভয় বা সংকোচ নয়—প্রয়োজন সচেতনতা।মনে রাখুন—প্রস্রাবের সমস্যাকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে অবহেলা করবেন না। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাই পারে আপনাকে জটিলতা থেকে রক্ষা করতে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব