প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মায়ের অদম্য ত্যাগে জয়: তিন যমজ ভাই এখন তিন মেডিকেলে
আমজাদ হোসেন, সংবাদদাতা ||
মায়ের অদম্য ত্যাগে জয়: তিন যমজ ভাই এখন তিন মেডিকেলেআমজাদ হোসেন মিঠু,বিশেষ প্রতিনিধি:চিকিৎসার অভাবে ছোটবেলায় বাবা মারা যান। সংসারে তখন এক বিধবা মা, তিন যমজ ছেলে আর এক মেয়ে—সামনে ছিল ঘোর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কিন্তু সব বাধা ও প্রতিকূলতাকে হার মানিয়েছেন মা আর্জিনা বেগম এবং তাঁর তিন অদম্য ছেলে।বগুড়ার ধুনট উপজেলার বথুয়াবাড়ি গ্রামের স্কুলশিক্ষক গোলাম মোস্তফা ২০০৯ সালে মারা যান। তখন তাঁর তিন যমজ ছেলে মফিউল হাসান, শাফিউল ইসলাম ও রাফিউল হাসানের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। স্বামীকে হারিয়ে চার সন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন আর্জিনা বেগম।সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা কখনোই থামতে দেননি তিনি। নিজের হাতে কৃষিজমিতে আবাদ করেছেন, স্বামীর রেখে যাওয়া জমি বন্ধক রেখেছেন, এমনকি ছেলেদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে শেষ সম্বল প্রায় চার বিঘা জমি বিক্রিও করে দিয়েছেন। মায়ের সেই মহান ত্যাগ বৃথা যায়নি।তিন ভাই একসঙ্গেই বড় হয়েছেন, একই স্কুল-কলেজে পড়েছেন এবং এসএসসি ও এইচএসসি—উভয় পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। এরপর শুরু হয় তাঁদের মেডিকেলে পড়ার স্বপ্নপূরণের লড়াই।মফিউল হাসান ২০২৩ সালে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। পরের বছর শাফিউল ইসলাম দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজে এবং রাফিউল হাসান নোয়াখালীর আব্দুল মালেক মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। অর্থাৎ, তিন যমজ ভাই এখন তিনটি আলাদা সরকারি মেডিকেল কলেজে ভবিষ্যৎ চিকিৎসক হওয়ার পথে অধ্যায়নরত।তবে এই গল্পের সবচেয়ে আবেগের জায়গাটা লুকিয়ে আছে মায়ের নিরন্তর দুশ্চিন্তায়। ছেলেদের এই অনন্য সাফল্যে মা আর্জিনা বেগম আনন্দিত হলেও ভাবনায় ছেদ পড়েনি। তিন ছেলের মেডিকেল পড়ার খরচ কীভাবে চালাবেন আর একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ কীভাবে নিশ্চিত করবেন—সেই চিন্তায় এখনো রাত কাটে তাঁর।তিন ভাইও খুব ভালোভাবে জানেন, তাঁদের এই দূরন্ত পথচলার পেছনে শুধু মেধা নয়, লুকিয়ে আছে মায়ের অসীম বিসর্জন। শাফিউলের ভাষায়, "বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। এখন আমাদের মা-ই বাবার অভাব পূরণ করছেন।"সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেখানে সামান্য অভাবে অনেক সন্তান পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়ে, সেখানে এই মা নিজের জমি বিক্রি করে সন্তানদের স্বপ্ন কিনে দিয়েছেন। আর তিন ভাই প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছা ও সুযোগ থাকলে অবহেলিত গ্রামের সন্তানরাও দেশের সেরা চিকিৎসকদের তালিকায় নিজেদের নাম লেখাতে পারে।একজন মায়ের কাছে সন্তানের সাফল্যই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর্জিনা বেগম তাঁর সেই সম্পদ মাটির নিচে না রেখে বুনে দিয়েছেন তিন ছেলের স্বপ্নের মধ্যে।একদিন হয়তো মফিউল, শাফিউল আর রাফিউল—তিনজনই গায়ে সাদা অ্যাপ্রন জড়িয়ে মানুষের সেবা করবেন। সেদিন তাঁদের অর্জিত প্রতিটি সাফল্যের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় নামটি খোদাই করা থাকবে—তাঁদের রত্নগর্ভা মা।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব