প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা বঞ্চিত প্রসূতি প্রাইভেট ক্লিনিকে জিম্মি দুই কাগজের ফাঁকা ঘরে ঢাকা পড়েছে অদৃশ্য সিন্ডিকেট
মোঃ রেজাউল করিম , সংবাদদাতা ||
সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিটটি সম্পূর্ণ সাদা, নেই কোনো চিকিৎসকের সিল কিংবা স্বাক্ষর। অপরদিকে শহরের প্রাইভেট ক্লিনিকের ক্যাশ মেমোতেও, ডাক্তারের নাম ও কেবিন নম্বর, এর ঘর দুটি রহস্যজনকভাবে সম্পূর্ণ ফাঁকা। সুনামগঞ্জে জগন্নাথপুর উপজেলার এক ভূমিহীন দিনমজুরের প্রসূতি স্ত্রীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে জিম্মি করার ঘটনায় নজিরবিহীন প্রশাসনিক জালিয়াতি ও তথ্য প্রমাণ মিলেছে।আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচতে এবং সরকারি চাকরি বিধিমালা ফাঁকি দিতে সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিক। উভয় পক্ষই নথিপত্রে সুনির্দিষ্ট চতুরতার আশ্রয় নিয়েছে বলে দেখা গেছে।জরুরি বিভাগেই পাতা হয় দালালদের ফাঁদ, জানা যায়, ভুক্তভোগী প্রসূতি তানজিনা বেগম (২২) সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলি ইউনিয়নের উচ্চ গ্রাম এলাকার এক দরিদ্র দিনমজুরের স্ত্রী। বর্তমানে তারা প্রধানমন্ত্রীর উপহারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের সরকারি ঘরের বাসিন্দা। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তানজিনা বেগম প্রসব বেদনায় সারাদিন ছটফট করার পর রাতে সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসেন (বহির্বিভাগ টিকিট নং- ৮২০৪) context,প্রসূতির সাথে ওনার স্বামী ছিলেন না, ছিলেন ওনার ভাবি ও দুই চাচিসহ মোট তিন গ্রামীণ নারী। জরুরি বিভাগে যাওয়ার পর কর্তব্যরত অজ্ঞাত চিকিৎসক রোগীকে ভর্তি না করে মুখে চরম ভীতি প্রদর্শন করে বলেন। এখানে সিজার করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, বাচ্চার জীবন বাঁচানো যাবে না, দ্রুত সিলেট ওসমানী মেডিকেলে নিয়ে যান। চিকিৎসকের মুখে এমন ভীতি প্রদর্শনের পর অসহায় ও দরিদ্র নারীরা হাসপাতালের বারান্দায় বসে কী করবেন তা ভেবে দিশেহারা হয়ে কাঁদছিলেন।ঠিক এই চরম অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওত পেতে থাকা একটি সক্রিয় দালাল চক্রের দুই সিএনজি অটোরিকশা চালক। তারা সিলেট যাওয়ার দূরত্বের ভয় দেখিয়ে ও উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দিয়ে কৌশলে প্রসূতিকে হাসননগরের আনিসা হেলথ কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। পরিবারটি টাকার সংকটের কথা জানালে চালকেরা বলে। টাকার চিন্তা পরে করবেন, রোগীকে বাঁচানো আগে, প্রয়োজনে আপাতত আমরাই হেল্প করে ভর্তি করে দেব। এরপর প্রসূতি ও নবজাতকের জীবন বাঁচানোর তাগিদে নিরুপায় হয়ে তারা ক্লিনিকে যেতে রাজি হলে, সিএনজি চালক নিজেই মধ্যস্থতাকারী হয়ে ২৮ হাজার টাকায় সিজারিয়ান অপারেশনের একটি মৌখিক চুক্তি (কন্টাক্ট) করে রোগীকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে চলে যায়। জানা গেছে, আমবাড়ি এলাকার সিএনজি চালক, এই প্রসূতির খোঁজখবর রাখছেন।ওষুধের নামে অতিরিক্ত ১২ হাজার টাকা লুট, রসিদ গায়েব,অপারেশনের পর প্রসূতির দিনমজুর ভাই এসে অভিভাবক (গার্জিয়ান) হিসেবে ক্লিনিকে দায়িত্ব নেন। তিনি আসার পর দেখতে পান, ওই দুই সিএনজি চালক ক্লিনিকের আড়ালে কানাকানি করছে, যা দেখে তার মনে তীব্র সন্দেহের সৃষ্টি হয়। চিকিৎসা চলাকালীন আনিসা হেলথ কেয়ারে থাকা, ফার্মেসি থেকে রোগীর ওষুধের জন্য প্রসূতির ভাইয়ের কাছ থেকে নগদ ১২ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ১২ হাজার টাকার ওষুধের বিপরীতে প্রসূতির ভাইকে কোনো অফিশিয়াল রসিদ বা হিসাব দেওয়া হয়নি। এই খরচটি মূল ২৮ হাজার টাকার কন্টাক্টের ভেতরে নাকি বাইরে, তা-ও খোলাসা করেনি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।প্রসূতির দুটি অফিশিয়াল কাগজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিটে কোন ডাক্তার রোগীকে দেখেছেন বা কেন রেফার করেছেন, তার কোনো বিবরণ বা চিকিৎসকের অফিশিয়াল সিল স্বাক্ষর নেই। এটি চিকিৎসকের দায় এড়ানোর চতুর কৌশল, যাতে কাগজে কোনো প্রমাণ না থাকে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (RMO) এবং তত্ত্বাবধায়ক সরাসরি অপরাধ না করলেও, তাদের নাকের ডগায় জরুরি বিভাগে দালাল চক্রের অবাধ বিচরণ এবং সরকারি নথিপত্রের এই নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার কারণে তারা প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা (Institutional Negligence) ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে দোষী।এদিকে আনিসা হেলথ কেয়ারের রসিদেও (নং ৫৭, তারিখ, ১৫/০৯/২০২৬) অত্যন্ত চতুরতার সাথে, Name of Doctor, এবং Cabin No. এর ঘর দুটি সম্পূর্ণ খালি রাখা হয়েছে, context কোন সার্জন ওটি করেছেন তা লুকাতে এবং রসিদ ছাড়া হাজার হাজার টাকা নগদ নিয়ে সরাসরি সরকারি ভ্যাট ও রাজস্ব ফাঁকি দিতেই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ এই পরিকল্পিত জালিয়াতি করেছে।বর্তমানে অপারেশনের চুক্তি অনুযায়ী রসিদবিহীন অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করতে না পারায় সুস্থ মা ও নবজাতক শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে পারছে না পরিবারটি। টাকার জন্য বর্তমানে ওই উপহারের ঘরের বাসিন্দা দিনমজুর পরিবারটি হাহাকার করছে।এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।ক্লিনিকের এই প্রকাশ্য জিম্মি বাণিজ্য, রসিদ ছাড়া টাকা লুট ও রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ ও ক্লিনিকটির লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব