প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আশুলিয়ায় বিস্ফোরণের ঘটনায় ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে মামলা: নেই মালিকপক্ষের নাম, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯
মোঃ মোস্তাফিজার রহমান আকাশ, সংবাদদাতা ||
আশুলিয়ায় বিস্ফোরণের ঘটনায় ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে মামলা: নেই মালিকপক্ষের নাম, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯মোঃ মোস্তাফিজার রহমান আকাশ , সাভার উপজেলা প্রতিনিধি (ঢাকা) ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপের কারখানা চত্বরে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অপরাধজনক নরহত্যার মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় প্রীতি গ্রুপের ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উল্লেখ করা হলেও কারখানার মালিকপক্ষের কাউকে আসামি করা হয়নি। এ নিয়ে শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছে- নিরাপত্তাজনিত বড় ধরনের দুর্ঘটনার দায় কি শুধু বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরই বর্তাবে?মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) আশুলিয়া থানার জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু তালেব বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে প্রীতি গ্রুপের জিএম মো. সোহেল রানা, এজিএম মো. মহিউদ্দিন, ম্যানেজার মো. মোজাম্মেল হোসেন, কারখানার ইঞ্জিনিয়ার মো. রাজীব হোসেন এবং দুই হেলপার মো. আল আমিন ও মো. এনামুলকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।জানা গেছে, প্রীতি গ্রুপের সিইও পদে রয়েছেন রাজীব আহমেদ তালুকদার পিয়াল। তাঁর মা পারভীন তালুকদার প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর এবং রেজিন আহমেদ তালুকদার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তবে বিস্ফোরণ ও প্রাণহানির ঘটনায় করা মামলায় মালিকপক্ষের কারও নাম নেই।প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, রাজীব আহমেদ তালুকদার পিয়াল কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ-সম্পাদক ও বাকেরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন এবং সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তাঁর মা পারভীন তালুকদার সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তবে মামলায় তাঁদের কাউকেই আসামি করা হয়নি।এ বিষয়ে প্রীতি গ্রুপের এমডি রেজিন আহমেদ তালুকদারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটির সভাপতি মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, কোনো কারখানায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু বেতনভুক্ত কর্মচারীদের দায়ী করা যৌক্তিক নয়। নিরাপত্তাব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মালিকপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে।তিনি বলেন, যানবাহনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যেমন পরিস্থিতি ও দায়িত্বের ভিত্তিতে মালিকপক্ষের দায় খতিয়ে দেখা হয়, তেমনি কারখানায় অগ্নিকাণ্ড বা নিরাপত্তাজনিত গাফিলতির ঘটনায়ও সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে যাঁদের দায়িত্বে সরাসরি অবহেলার তথ্য পাওয়া গেছে, মামলায় আপাতত তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মালিকপক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই।তিনি বলেন, মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি রাখা হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তে যাঁদের গাফিলতি বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।উল্লেখ্য, গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের 'এস সূহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক'-এর কারখানা চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারবাহী একটি লরিতে বিস্ফোরণ ঘটে। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে থাকা আরও কয়েকটি সিলিন্ডারবাহী গাড়িসহ অন্তত সাত থেকে আটটি গাড়িতে।বিস্ফোরণের তীব্রতায় একাধিক গ্যাস সিলিন্ডার ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ গজ দূরে আবাসিক এলাকা ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে গিয়ে পড়ে। কোনো কোনো সিলিন্ডার টিনের চালা ভেদ করে ঘরের ভেতরেও ঢুকে পড়ে।ঘটনার পর ঘটনাস্থল ও আশপাশে ছয়জনের মরদেহ পাওয়া যায়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত ও দগ্ধ হন।ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার পর কারখানা চত্বরে গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন মামলার তদন্তে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ, সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনায় কার দায়িত্ব ছিল, নিরাপত্তা নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না এবং দায়িত্বে অবহেলার সঙ্গে আরও কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না- এসব বিষয়ই গুরুত্ব পাচ্ছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব