প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পানির নিচে কতদিন থাকতে পারে সাবমেরিন? যে প্রযুক্তিতে দিনের পর দিন অদৃশ্য থাকে সমুদ্রের গভীরে
সৈয়দ উসামা , গণমাধ্যম কর্মী ||
সমুদ্রের বিশাল জলরাশির নিচে দিনের পর দিন অবস্থান করতে পারে সাবমেরিন। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি বিশাল ধাতব জাহাজের মতো মনে হলেও পানির নিচে দীর্ঘ সময় চলাচলের জন্য এর ভেতরে থাকে জটিল জীবনধারণ ব্যবস্থা, শক্তি উৎপাদন প্রযুক্তি, বায়ু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিশেষ নকশা। সাবমেরিনের পানির নিচে থাকার সক্ষমতা মূলত নির্ভর করে এর ইঞ্জিন বা শক্তির উৎস, আকার, মজুত সরঞ্জাম ও ক্রুদের প্রয়োজনীয়তার ওপর।কতদিন পানির নিচে থাকতে পারে?সাবমেরিনের ধরনভেদে পানির নিচে থাকার সময়ের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনকে নির্দিষ্ট সময় পর ব্যাটারি পুনরায় চার্জ করার জন্য পানির কাছাকাছি বা ভূপৃষ্ঠে আসতে হয়। তবে আধুনিক কিছু প্রচলিত সাবমেরিনে Air-Independent Propulsion (AIP) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হওয়ায় পানির নিচে থাকার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।অন্যদিকে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এগুলো দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকতে পারে এবং সাধারণত জ্বালানি পুনরায় ভরার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় পানির নিচে থাকার প্রধান সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায় না। বরং ক্রুদের খাবার, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সরবরাহের বিষয়গুলো দীর্ঘ অভিযানের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক সাবমেরিন উপযুক্ত পরিস্থিতিতে কয়েক মাস পর্যন্ত সমুদ্রে অবস্থান করতে সক্ষম হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি সাবমেরিন সবসময় এত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে; মিশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহের প্রয়োজন অনুযায়ী সময় পরিবর্তিত হয়।পানির নিচে অক্সিজেন আসে কোথা থেকে?সাবমেরিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ভেতরের বায়ু নিয়ন্ত্রণ। ক্রুরা শ্বাস নেওয়ার ফলে অক্সিজেন কমে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ে। তাই সাবমেরিনে বিশেষ ব্যবস্থা ব্যবহার করে বাতাসের গুণমান নিয়ন্ত্রণ করা হয়।আধুনিক সাবমেরিনে অক্সিজেন সরবরাহ, কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ এবং অন্যান্য বায়ু পরিশোধন ব্যবস্থা থাকে। ফলে বাইরের বাতাসের ওপর সরাসরি নির্ভর না করেও দীর্ঘ সময় ভেতরে থাকা সম্ভব হয়।এ ছাড়া পানিকে পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও থাকে। ফলে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় প্রয়োজনীয় মিঠা পানির ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা যায়।সাবমেরিন কীভাবে ডুবে ও ভেসে ওঠে?সাবমেরিনের শরীরে থাকা বিশেষ ব্যালাস্ট ট্যাংক এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ট্যাংকে পানি নেওয়া হলে সাবমেরিনের সামগ্রিক ভাসমান ক্ষমতা কমে এবং এটি পানির নিচে নামতে পারে। আবার ট্যাংক থেকে পানি বের করে তার জায়গায় বাতাস প্রবেশ করানো হলে ভাসমান ক্ষমতা বাড়ে এবং সাবমেরিন পানির উপরে উঠতে পারে।তবে গভীর পানিতে চলাচলের বিষয়টি শুধু ডুবে যাওয়া বা ভেসে ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাবমেরিনের আকৃতি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও বিশেষ ডাইভিং সারফেস ব্যবহার করে পানির নিচে অবস্থান ও গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।কোন কোন দেশ সাবমেরিন তৈরি করে?সাবমেরিন নির্মাণ অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তি। বিশ্বে পূর্ণাঙ্গ নকশা ও নির্মাণ সক্ষমতা থাকা দেশের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান ও সুইডেন দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব সাবমেরিন প্রযুক্তি ও নির্মাণ সক্ষমতার জন্য পরিচিত।এশিয়ায় চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতও নিজেদের সাবমেরিন নির্মাণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া নিজস্ব নকশার সাবমেরিন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে এবং জাপানও আধুনিক প্রচলিত সাবমেরিন তৈরিতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।ফ্রান্স ও জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সাবমেরিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ও রপ্তানিকারক। রাশিয়াও সাবমেরিন নির্মাণে দীর্ঘ ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। চীন বর্তমানে দ্রুতগতিতে সাবমেরিন নির্মাণ সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির নির্মাণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশেষ নজর কেড়েছে।শুধু বড় শক্তিধর দেশই নয়সাবমেরিন প্রযুক্তি এখন আর কেবল কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, স্পেন, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশ নিজস্বভাবে সাবমেরিন নির্মাণ, যৌথভাবে নির্মাণ অথবা বিদেশি প্রযুক্তির ভিত্তিতে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলছে।অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘমেয়াদি AUKUS কর্মসূচির মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের মতো দেশ নিজস্ব প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করছে।কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন?সমুদ্রের বিশাল পরিসরে একটি সাবমেরিনকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। এই কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন নৌবাহিনীর কাছে সাবমেরিন গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক সাবমেরিনে শব্দ কমানোর প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘসময় পানির নিচে থাকার সক্ষমতা যুক্ত হচ্ছে।তবে সাবমেরিনের শক্তি শুধু এর অস্ত্র বা আক্রমণ সক্ষমতায় নয়; দীর্ঘসময় অদৃশ্যভাবে পানির নিচে অবস্থান, তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং সমুদ্রভিত্তিক কৌশলগত উপস্থিতিও এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।শেষ কথাপানির নিচে দীর্ঘসময় টিকে থাকার পেছনে একটি মাত্র প্রযুক্তি কাজ করে না। শক্তির উৎস, ব্যাটারি বা পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, বায়ু পরিশোধন, অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা, পানি পুনর্ব্যবহার, খাবারের মজুত এবং উন্নত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা—সবকিছুর সমন্বয়েই একটি সাবমেরিন দীর্ঘ সময় সমুদ্রের গভীরে থাকতে পারে।তাই একটি সাবমেরিনকে শুধু ‘পানির নিচে চলা জাহাজ’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত প্রযুক্তিগত জটিলতা বোঝা যায় না। এটি একই সঙ্গে প্রকৌশল, সামুদ্রিক প্রযুক্তি, শক্তি ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি মানবজীবন ধারণ ব্যবস্থার এক অসাধারণ সমন্বয়।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব