প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এআইয়ের ‘পিপাসা’য় চাপে পড়তে পারে বিশ্বের পানিসম্পদ
সৈয়দ উসামা , গণমাধ্যম কর্মী ||
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর ভবিষ্যতের কোনো প্রযুক্তি নয়—মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা, শিক্ষা, গবেষণা ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সামনে আসছে পরিবেশগত একটি বড় প্রশ্ন—এআই চালাতে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি প্রয়োজন হচ্ছে, তার চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে কোথায়?জাতিসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণা উদ্যোগের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এআই-নির্ভর ডেটা সেন্টারগুলোর ক্রমবর্ধমান পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এআই-সংশ্লিষ্ট ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা বছরে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে।এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্রা কতটা বড়, তার একটি তুলনামূলক চিত্রও গবেষণায় পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার সম্মিলিত বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার কাছাকাছি হতে পারে। অর্থাৎ এআই প্রযুক্তির বিস্তার শুধু প্রযুক্তি খাতের বিদ্যুৎ চাহিদাই বাড়াচ্ছে না, এর প্রভাব জাতীয় ও বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।তবে বিদ্যুতের চেয়েও উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠছে পানির ব্যবহার।এআই মডেল প্রশিক্ষণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং কোটি কোটি অনুরোধের উত্তর দিতে যে বিশাল ডেটা সেন্টার অবকাঠামো প্রয়োজন, সেগুলো পরিচালনায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। সার্ভার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে বিভিন্ন ধরনের শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এসব ব্যবস্থার কিছু ক্ষেত্রে পানির প্রয়োজন হয়। ফলে এআই ব্যবহারের পরিমাণ যত বাড়ছে, ডেটা সেন্টারগুলোর পানি ব্যবহারের চাপও তত বাড়ছে।গবেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান গতিধারা বদলানো না গেলে দশকের শেষ নাগাদ এআই-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর বার্ষিক পানির ব্যবহার প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের এক বছরের গৃহস্থালি পানির চাহিদার সমপরিমাণ হতে পারে।অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে ১৩০ কোটি মানুষের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত পানি সরাসরি ডেটা সেন্টারগুলো নিয়ে নেবে। বরং তুলনাটি এআই অবকাঠামোর সম্ভাব্য পানির ব্যবহার কতটা বড় হতে পারে, সেটি বোঝানোর একটি পরিমাপক। একই সঙ্গে কোন অঞ্চলে ডেটা সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে এবং সেখানে পানির সংকট কতটা তীব্র—তার ওপর বাস্তব পরিবেশগত প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে।সুফলের পাশাপাশি অসম পরিবেশগত বোঝাএআইয়ের ইতিবাচক ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়েই ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। চিকিৎসা গবেষণা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে শুরু করে শিল্প ও প্রশাসনিক কাজে এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ফলে প্রযুক্তিটির সুফল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।কিন্তু এর অবকাঠামোগত ব্যয়ের বোঝা সব জায়গায় সমানভাবে পড়ে না।যে অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে, সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পানির সংকট রয়েছে এমন এলাকায় বড় ডেটা সেন্টার স্থাপন হলে স্থানীয় মানুষের পানির চাহিদা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যবহারএআইয়ের প্রসার থামিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং এখন প্রয়োজন এমন প্রযুক্তি ও অবকাঠামো তৈরি করা, যেখানে একই সঙ্গে কম বিদ্যুৎ ও কম পানি ব্যবহার করে বেশি কার্যক্ষমতা অর্জন করা যায়।ডেটা সেন্টারে পানি পুনর্ব্যবহার, অধিক কার্যকর কুলিং প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং পানিসংকটপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো স্থাপনের ক্ষেত্রে কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়ন—এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।এআই যত শক্তিশালী হচ্ছে, তার পরিবেশগত পদচিহ্নও তত বড় হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি পরিকল্পনায় শুধু এআই কত দ্রুত ও কত নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে—সেটি দেখলেই হবে না; একই সঙ্গে দেখতে হবে, সেই প্রযুক্তি চালাতে কত পানি, কত বিদ্যুৎ এবং কতটা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যয় হচ্ছে।প্রযুক্তির অগ্রগতি যদি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য হয়, তাহলে সেই অগ্রগতির মূল্য যেন মানুষের মৌলিক সম্পদ—বিশেষ করে পানি ও পরিবেশ—দিয়ে পরিশোধ করতে না হয়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব