জনতার অনলাইন প্রেস ক্লাব

লেখার ক্ষেত্রে এআই আমাদের কতটা সাহায্য করছে

আজকের ডিজিটাল যুগে লেখালেখির ধরন বদলে গেছে। কোনো একটি আইডিয়া মাথায় এলে অনেকে এখন তা এআই সিস্টেমের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তাঁদের আইডিয়াগুলো এআইকে বুঝিয়ে দিয়ে সেখান থেকে খসড়া বা ড্রাফট তৈরি করিয়ে নেন অনেকে। তারপর তা নিজের মতো করে সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। লেখালেখির সময় বাঁচাতে এআই ব্যবহার করা খারাপ কিছু নয়। তবে এতে একটি বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেকে নিজের লেখার মান বা চিন্তার গভীরতা বাড়াতে এআই ব্যবহার করছেন না। তাঁরা শুধু কষ্ট এড়াতে এর ওপর নির্ভর করছেন। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এআই স্লপ বা মানহীন কনটেন্ট। এই লেখাগুলোতে কথার পর কথা থাকে। কিন্তু কাজের কথা থাকে সামান্যই। দেখা গেছে, খ্যাতনামা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত বায়োমেডিসিন-বিষয়ক গবেষণাপত্রগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশেই কোনো না কোনোভাবে এআইয়ের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এবার প্রশ্ন হলো, এআই কি সত্যিই লেখার মূল উদ্দেশ্যে আমাদের সাহায্য করতে পারছে। আজকাল অনেকে মিটিংয়ের নোট, বিভিন্ন টিকিটের তথ্য বা ই-মেইল থেকে ঝটপট একটি স্ট্যাটাস আপডেট বানিয়ে দেওয়ার জন্য এআইকে নির্দেশ দেন। এতে দেখতে সুন্দর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তৈরি হয়। সময়ও কম লাগে। কিন্তু এর ফলে কাজের আসল পরিস্থিতির সঙ্গে কর্মীর সরাসরি সম্পর্ক বা মূল তথ্য বোঝার গভীরতা কমে যায়। আপনি নিজে না লিখলে সেই প্রজেক্ট সম্পর্কে কি সত্যিই আপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে? কোনো বিষয় নিয়ে নিজে গভীরভাবে চিন্তা না করে শুধু এআই দিয়ে বানিয়ে নিলে নিজের কাজের ওপর দখল হারাতে হয়। অনেকে লেখালেখিকে একধরনের ব্ল্যাক বক্স বা রহস্যময় বিষয় বলে মনে করেন। অনেকে মনে করেন, তাঁরা বুঝতে পারেন না যে কোন লেখা পাঠকের মনে ঠিক কেমন প্রভাব ফেলবে। তাঁরা হয়তো যা বলতে চাইছেন, তা লেখায় ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না। এমন ধারণা হওয়ার পেছনে মানুষের পারিপার্শ্বিক পরিবেশও কিছুটা দায়ী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা কর্মক্ষেত্রে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে অনেকের মধ্যে লেখার প্রতি ভয় তৈরি হয়। আর এই ভয় থেকে তাঁরা লেখার মূল দায়িত্ব এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন। অথচ মনোভাষাবিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে, লেখালেখি কোনো জটিল রহস্য নয়। এর পেছনে নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক নিয়ম রয়েছে। এআইয়ের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে কিছু সহজ কৌশল প্রয়োগ করলে যেকোনো লেখা অনেক বেশি কার্যকর ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। শিরোনাম ও সাব-হেডিংয়ের মাধ্যমে মাইন্ডসেট তৈরি: পাঠক কীভাবে একটি লেখা গ্রহণ করবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করে শিরোনাম ও সাব-হেডিংয়ের ওপর। সাব-হেডিং পাঠকের মনে লেখার মূলভাব সম্পর্কে শক্তিশালী ধারণা তৈরি করে। এমনকি লেখার ভেতরে অসংগতি থাকলেও পাঠক সাব-হেডিংয়ের আলোকেই বিষয়টি মনে রাখেন। লেখা শুরুর আগে সঠিক সাব-ক্যাপশন তৈরি করে নিলে লেখার মূল ধারা ঠিক থাকে। তখন শূন্য খাতা দেখে ভয় পাওয়ার সমস্যা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সঠিক অবস্থান: মানুষ সব সময় কোনো তালিকা, অনুচ্ছেদ বা বাক্যের শুরু এবং শেষের তথ্যগুলো বেশি মনে রাখে। যেকোনো লেখার শুরু ও শেষটা ভালো হলে তবেই তা পাঠক ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে। পাঠকেরা যেকোনো লেখার প্রথম কিছু বাক্য অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়েন। কারণ, তাঁরা আশা করেন, সেখানেই পুরো বিষয়ের মূল নির্যাস থাকবে। তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো শুরুতে বা শেষে রাখা উচিত। আর যদি এমন কোনো অপ্রধান তথ্য থাকে, যা শুধু জানানোর জন্য দেওয়া দরকার, তবে তা অনুচ্ছেদের ঠিক মাঝখানের বাক্যে লুকিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। বাক্যগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ধারাবাহিকতা: প্রতিটি বাক্য আলাদা দ্বীপের মতো না রেখে তাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা জরুরি। একটি বাক্যের শেষে যে বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে, তার পরের বাক্যের শুরুতে সেইবিষয়ক শব্দ ব্যবহার করে বা উপযুক্ত সংযোগকারী শব্দ ব্যবহার করে দুটি বাক্যের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতে হয়। যেমন তবে, ফলে, উদাহরণ হিসেবে। এতে পাঠকের পড়তে সুবিধা হয় এবং লেখার গতি বাড়ে। লেখালেখি শুধু কিছু শব্দ সাজানো নয়, এর মাধ্যমে পাঠকের মস্তিষ্কের সঙ্গে একধরনের যোগাযোগ তৈরির চেষ্টা করতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনাকে দ্রুত লেখা লিখে দিতে পারে। কিন্তু আপনার চিন্তা, আবেগ ও কৌশলের বিকল্প হতে পারে না। লেখার এই মনস্তাত্ত্বিক নিয়মগুলো আয়ত্ত করতে পারলে এআইয়ের সাহায্য ছাড়াও যেকোনো লেখক পাঠকের মন জয় করতে পারবেন। এগুলো মেনে চললে নিজের লেখার মান একধাপ বাড়িয়ে নিতে পারবেন। সূত্র: সাইকোলজি টুডে, মিডিয়াম

লেখার ক্ষেত্রে এআই আমাদের কতটা সাহায্য করছে