ব্রিজ নির্মাণ হয়েছে। অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ব্রিজের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সড়ক সংযোগ পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় এর সুফল থেকে এখনো বঞ্চিত সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদ গ্রামের মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে বিকল্প পথে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বর্ষা এলেই অল্প দূরত্বের পথ পরিণত হয় দীর্ঘ ও দুর্ভোগের যাত্রায়। অনেক ক্ষেত্রে নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।
এদিকে গণিগঞ্জ বাজারসংলগ্ন নদীর পূর্বপাড়ের খেয়াঘাটে সোলার বাতির ব্যাটারি চুরি হয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যার পর ঘাটটি অন্ধকারে ডুবে থাকে। প্রতিদিনের যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাটে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি।
প্রশ্ন উঠছে, যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণের পরও যদি তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ নিশ্চিত না হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের প্রকৃত সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নোয়াখালী বাজার ও পাথারিয়া বাজারসংলগ্ন দুটি ব্রিজ নির্মাণের ফলে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ব্রিজ দুটির সঙ্গে আশপাশের সব এলাকার প্রয়োজনীয় সড়ক সংযোগ এখনো পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় সেই সম্ভাবনা বাস্তবে পুরোপুরি কাজে লাগছে না।
পাথারিয়া বাজার সংলগ্ন ব্রিজের সংযোগ সড়ক আসামমুড়া হয়ে শ্রীনাথপুর ও পুরাতন জাহানপুরের দিকে যোগাযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে নোয়াখালী বাজারসংলগ্ন ব্রিজের সঙ্গে জামলাবাদ সড়কের সংযোগ রয়েছে।
কিন্তু হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদকে এই যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সড়ক সংযোগ নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয়দের সরাসরি প্রশ্ন—দুটি ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনার সময় কি পুরো এলাকার সংযোগ সড়ককে একই পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া হয়েছিল। হয়ে থাকলে তা এখনো পূর্ণাঙ্গ হলো না কেন। আর না হয়ে থাকলে ব্রিজ নির্মাণের সুফল কীভাবে প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাবে।
বর্ষা মৌসুমে নদী ও জলাবদ্ধতার পানি বাড়লে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কাছাকাছি গ্রামের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় বাসিন্দাদের বিকল্প ও ঘুরপথে চলাচল করতে হয়।
এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও রোগীদের ওপর। কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে তৈরি হয় ভোগান্তি। অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিতে বাড়তি সময় লাগে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক যোগাযোগের এই বিচ্ছিন্নতা শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
দুটি ব্রিজের পূর্ণাঙ্গ সংযোগের পাশাপাশি গণিগঞ্জ বাজার থেকে নদীর পূর্বপাড়ে একটি ছোট সেতুর প্রয়োজনীয়তার কথাও জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের মতে, গণিগঞ্জ বাজার ও পূর্বপাড়ের মধ্যকার নদীপথ খুব বেশি দীর্ঘ নয়। এখানে একটি ছোট সেতু নির্মাণ করা গেলে খেয়াঘাটনির্ভর যোগাযোগের ওপর চাপ কমবে এবং পূর্বপাড়ের মানুষের বাজার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবায় যাতায়াত সহজ হবে।
শুধু যোগাযোগ নয়, পরিকল্পিত সড়ক ও সেতু নির্মাণ হলে পূর্বপাড়ের সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোও অর্থনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
পাথারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই ইউনিয়নের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদ, এই তিনটি গ্রামের সঙ্গে দুটি ব্রিজের পূর্ণাঙ্গ সংযোগ আরও আগেই পরিকল্পনার মধ্যে রাখা প্রয়োজন ছিল। শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বর্ষা এলে অল্প দূরত্বের পথ অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়। তখন নৌকা ছাড়া মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
চেয়ারম্যান বলেন, এই তিনটি গ্রামের সঙ্গে ব্রিজগুলোর পূর্ণাঙ্গ সংযোগ হয়ে গেলে পূর্বপাড়ের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। রাস্তাঘাটের জটিলতা অনেকটাই কমে যাবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
তার ভাষ্য, ইউনিয়নে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি গ্রামীণ অবকাঠামো, রাস্তাঘাট ও আলোর ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ করেছেন। তবে বড় ধরনের ও দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও সমন্বিত উদ্যোগ।
শহিদুল ইসলাম বলেন, মাননীয় এমপি মহোদয়ের নজরে বিষয়টি আনা প্রয়োজন। এ জন্য এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি, নেতাকর্মীসহ সবার সহযোগিতা দরকার। সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া গেলে খুব শিগগিরই হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদের সঙ্গে ব্রিজগুলোর পূর্ণাঙ্গ সংযোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে আমি আশাবাদী।”
তিনি আরও বলেন, দুটি ব্রিজের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে পূর্বপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনাও বিকশিত হতে পারে।
যোগাযোগের এই সংকটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গণিগঞ্জ খেয়াঘাটের অন্ধকার। ঘাটে স্থাপিত সোলার বাতির ব্যাটারি চুরি হওয়ার পর বাতিটি অচল হয়ে পড়েছে।
সন্ধ্যার পর অন্ধকার ঘাটে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের। নদীর পাড়ে ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়। নারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের জন্য ঝুঁকিটি আরও বেশি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ অবস্থায় শুধু চুরি যাওয়া ব্যাটারি প্রতিস্থাপন নয়, নদীর পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাড়ে স্থায়ী আলোর ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে।
পাথারিয়ার এই বাস্তবতা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। একটি ব্রিজ নির্মাণ করলেই কি যোগাযোগ অবকাঠামোর কাজ শেষ।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পরিকল্পনার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে একটি সেতুর কার্যকারিতা শুধু মূল কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে সংযোগ সড়ক, প্রবেশপথ, নিরাপদ চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সামগ্রিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নোয়াখালী ও পাথারিয়া বাজারসংলগ্ন দুটি ব্রিজের অসম্পূর্ণ সংযোগগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ করা হবে। একই সঙ্গে গণিগঞ্জ বাজার থেকে পূর্বপাড়ে ছোট সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।
তাহলেই নির্মিত অবকাঠামো শুধু দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়ে থাকবে না; তা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে।
এখন প্রশ্ন একটাই—দুটি ব্রিজের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সংযোগ কবে হবে, আর গণিগঞ্জ থেকে পূর্বপাড়ে ছোট সেতুর স্বপ্নই বা কবে বাস্তবায়িত হবে।
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, পাথারিয়ার উন্নয়ন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই পৌঁছাবে হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদের মানুষের দোরগোড়ায়।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬

মতামত