ফেনী সদর হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু
নার্সকে দায়ী করার আগে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি মানবাধিকার সংগঠনের দুই নেতার
ফেনী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে সাপে কাটা এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় কোনো ব্যক্তি বা নার্সকে সরাসরি দায়ী করার আগে ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহায়তাকারী সংস্থা কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা।
তারা হলেন—সংস্থাটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কাশেম এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সহকারী যুগ্ম মহাসচিব ও ফেনী জেলা আঞ্চলিক পরিচালক মোহাম্মদ হানিফ।
সংগঠনের নেতারা বলেন, সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জরুরি বিষয়। এ ধরনের ঘটনায় রোগীর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল কি না, প্রয়োজনীয় ওষুধ বা অ্যান্টিভেনম সময়মতো দেওয়া হয়েছিল কি না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই না করে কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়।
তাদের মতে, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর কোনো নির্দিষ্ট নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীকে দায়ী করে জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হলে প্রকৃত ঘটনা আড়ালে থেকে যেতে পারে। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা জরুরি।
মোহাম্মদ আবুল কাশেমের বক্তব্য
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহায়তাকারী সংস্থা কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কাশেম বলেন, “সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একজন রোগীর মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে কোনো নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীকে দায়ী করা উচিত নয়।”
তিনি বলেন, “চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে কখন পৌঁছেছেন, সাপে কাটার কতক্ষণ পর চিকিৎসা শুরু হয়েছে, রোগীর শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম যথাসময়ে দেওয়া হয়েছিল কি না এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় কোনো গাফিলতি বা ত্রুটি ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।”
মোহাম্মদ আবুল কাশেম আরও বলেন, “আমরা কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলছি না। আমরা চাই সত্য উদঘাটিত হোক। যদি কারও দায়িত্বে অবহেলা বা চিকিৎসাগত ত্রুটি থেকে থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আবার যদি সংশ্লিষ্ট নার্স বা চিকিৎসকের কোনো দোষ না থাকে, তাহলেও তাদের অযথা হয়রানি বা সামাজিকভাবে হেয় করা উচিত নয়।”
তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।
মোহাম্মদ হানিফের বক্তব্য
সংস্থাটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সহকারী যুগ্ম মহাসচিব ও ফেনী জেলা আঞ্চলিক পরিচালক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, “একজন রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নার্সকে দায়ী করার আগে সব তথ্য যাচাই করা দরকার। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ন্যায়সংগত নয়।”
তিনি বলেন, “হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কীভাবে হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স কখন রোগীকে দেখেছেন, কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম বা অন্যান্য চিকিৎসা যথাসময়ে নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা উচিত।”
মোহাম্মদ হানিফ আরও বলেন, “আমরা চাই ফেনী সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখুক। রোগীর পরিবার যেন প্রকৃত ঘটনা জানতে পারে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো স্বাস্থ্যকর্মীকে গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়ী করে বিচার করা ঠিক হবে না।”
নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান
মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা বলেন, কোনো রোগীর মৃত্যু হলে তার পরিবার যেমন ন্যায়সঙ্গত তদন্ত ও সত্য উদঘাটনের অধিকার রাখে, তেমনি চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও ন্যায়সংগত তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
তারা বলেন, এ ধরনের ঘটনায় আবেগের পরিবর্তে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি, রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময়, চিকিৎসা প্রদানের সময়সূচি, ব্যবহৃত ওষুধ ও অ্যান্টিভেনমের তথ্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সদের বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য পর্যালোচনা করলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে সহায়তা করতে পারে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে ফেনী সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের প্রতি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির সুষ্ঠু নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, “দোষী হলে শাস্তি, আর নির্দোষ হলে দায়মুক্তি”—এই নীতির ভিত্তিতেই তদন্ত হওয়া উচিত। এতে একদিকে যেমন রোগীর পরিবার ন্যায়বিচার পাবে, অন্যদিকে নির্দোষ কোনো চিকিৎসক বা নার্সও অযথা হয়রানি থেকে রক্ষা পাবেন।
তারা আরও বলেন, ফেনী সদর হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, অ্যান্টিভেনমের প্রাপ্যতা, জরুরি চিকিৎসা সেবার সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় জনবলসহ সার্বিক বিষয়ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সাপে কাটা রোগীদের দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানান তারা।
তবে ঘটনার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট নার্সের বক্তব্য এবং মৃত্যুবরণকারী রোগীর পরিচয় ও চিকিৎসা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ সংবাদ তৈরি করা যাবে।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত