ফেনী সদর হাসপাতালে ‘দালালচক্রের’ টার্গেটে রোগীরা!
কম খরচে পরীক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিকে নেওয়ার অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনাসহ তদন্তের দাবি
ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ঘিরে একটি ‘দালালচক্র’ সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে।
চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীরা বের হলেই তাদের টার্গেট করে ‘কম খরচে পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার’ প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন রোগী ও স্বজন।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের বহির্বিভাগ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাউন্টার ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করে কয়েকজন ব্যক্তি রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাদের নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তবে কারা এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, কোনো নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র রয়েছে কি না কিংবা এ ঘটনায় কোনো আর্থিক লেনদেন হচ্ছে কি না—এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রেসক্রিপশন দেখেই শুরু ‘সহানুভূতি’!
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নেওয়ার পর রোগী পরীক্ষা করানোর উদ্দেশ্যে বের হলেই কয়েকজন ব্যক্তি তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন।
প্রথমে রোগীর অসুস্থতা ও আর্থিক অবস্থার কথা জানতে চাওয়া হয়। এরপর প্রেসক্রিপশনে থাকা পরীক্ষা-নিরীক্ষার তালিকা দেখে বলা হয়, হাসপাতালের বাইরে তাদের ‘পরিচিত’ প্রতিষ্ঠানে গেলে একই পরীক্ষা তুলনামূলক কম খরচে করা যাবে।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, কথাবার্তার একপর্যায়ে তাদের স্বাধীনভাবে পছন্দ করার সুযোগ না দিয়ে নির্দিষ্ট একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
‘কম খরচে পরীক্ষা’—প্রস্তাব, নাকি রোগী টানার কৌশল?
স্থানীয় কয়েকজন রোগী ও স্বজনের প্রশ্ন, সত্যিই যদি রোগীদের অর্থ সাশ্রয় করাই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে হাসপাতালের নির্ধারিত কাউন্টার বা তথ্যকেন্দ্রের পরিবর্তে হাসপাতাল এলাকায় অবস্থান করে কেন রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে?
তাদের অভিযোগ, অপরিচিত ব্যক্তির এমন প্রস্তাবে সাড়া দিতে গিয়ে রোগীরা কোথায় পরীক্ষা করাবেন, কত টাকা দেবেন এবং রিপোর্টের বিষয়ে কার কাছে জবাবদিহি করবেন—এসব নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন।
বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হলে তা রোগীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
কারা এই ‘চক্রে’? প্রশ্নের উত্তর মিলছে না
সম্প্রতি হাসপাতালের বহির্বিভাগ এলাকায় একজন ব্যক্তিকে রোগীদের সঙ্গে এ ধরনের কথাবার্তা বলতে দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সহযোগী রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে তাদের পরিচয়, কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
ফলে অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা বের করতে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, রোগী-স্বজনদের বক্তব্য গ্রহণ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে খোঁজ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
রোগীর দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে?
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি বড় অংশ স্বল্প আয়ের। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসার জন্য এসে হাসপাতালের নিয়ম-কানুন বা পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না।
সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, এই অনভিজ্ঞতা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কেউ রোগীদের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গেলে তারা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তেও বিভ্রান্ত হতে পারেন।
তাদের মতে, হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত নজরদারি থাকলে এ ধরনের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র সহজেই বের করা সম্ভব।
রোগী-স্বজনদের সতর্ক থাকার পরামর্শ
সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, চিকিৎসক কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিলে অপরিচিত কারও কথায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। পরীক্ষার খরচ, কোথায় পরীক্ষা করা যাবে এবং সরকারি হাসপাতালে কোনো নির্ধারিত ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কাউন্টার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
কেউ হাসপাতাল থেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করানোর জন্য চাপ দিলে তার পরিচয় জানতে এবং বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
তদন্তেই মিলবে আসল সত্য
ফেনী সদর হাসপাতালকে কেন্দ্র করে ওঠা ‘দালালচক্রের’ অভিযোগ কতটা সত্য, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কোনো বেসরকারি ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র রয়েছে কি না—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা যদি হাসপাতাল চত্বরেই অপরিচিত ব্যক্তিদের টার্গেটে পরিণত হন, তাহলে রোগী হয়রানি ঠেকাতে বিদ্যমান নজরদারি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
রোগীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, হাসপাতাল এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত