ঘুষ ও দুর্নীতির মতো অর্থনৈতিক ও চারিত্রিক ব্যাধির প্রতিকারে তরুণ প্রজন্মই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি
বিশেষ প্রতিবেদন
একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ প্রজন্ম। আর সেই তরুণ যখন অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন একটি সমাজ বদলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। মাত্র ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ আজ সেই স্বপ্নেরই এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ঘুষ আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এই কিশোর। ‘ghush.site’ নামে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মাধ্যমে সে যেন আমাদের সমাজের এক ভয়াবহ বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—আমরা আর কতদিন ঘুষকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেব? আর কতদিন দুর্নীতির কাছে মাথা নত করে থাকব?
ঘুষ ও দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে না; এটি ধীরে ধীরে একটি জাতির বিবেককে গ্রাস করে। একটি ঘুষের বিনিময়ে যখন ন্যায্য অধিকার বিক্রি হয়ে যায়, তখন শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। যখন দুর্নীতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন সততা হাস্যকর এবং অসততা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেও শাহেদের মতো একজন কিশোরের সাহস আমাদের নতুন করে আশাবাদী করে তোলে। যে বয়সে অনেক তরুণ শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে শাহেদ ভাবছে দেশের কথা, সমাজের কথা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে।
তার উদ্যোগের প্রতি সরকারি পর্যায়ে আগ্রহ এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে এই একটি কিশোরের গল্প শুধু প্রশংসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে—শাহেদের মতো আরও কত শত তরুণ দেশের পরিবর্তনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে!
আজ প্রয়োজন সেই তরুণদের পাশে দাঁড়ানো। প্রয়োজন তাদের সাহসকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা। প্রয়োজন তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে দেশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার কাজে লাগানো।
ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের একার নয়, কোনো একটি সংস্থারও নয়। এই লড়াই আমাদের সবার। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন—সব জায়গায় সততা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা মানুষকে ভয় দেখানো নয়, তাকে উৎসাহিত করতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদকারীকে একা ফেলে রাখলে সমাজে নীরবতা জন্ম নেয়; আর নীরবতা যত বাড়ে, দুর্নীতি তত শক্তিশালী হয়।
মাত্র ১৭ বছরের শাহেদ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—পরিবর্তন আনার জন্য সবসময় ক্ষমতা, পদ কিংবা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন একটি সৎ হৃদয়, একটি সাহসী কণ্ঠ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয়।
আজ শাহেদের গল্প হয়তো একজন কিশোরের গল্প। কিন্তু আগামীকাল এই গল্প হাজারো তরুণের প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে ঘুষ ছাড়া ন্যায্য অধিকার পাওয়া যাবে; যেখানে দুর্নীতির কাছে সততা পরাজিত হবে না; যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাবে না।
একটি ১৭ বছরের কিশোর যখন সমাজের বিবেককে নাড়া দিতে পারে, তখন কোটি মানুষের এই দেশে পরিবর্তন অসম্ভব নয়।
শাহেদের মতো সাহসী তরুণদের হাত ধরেই হয়তো একদিন আমরা দেখতে পাব একটি সত্যিকারের স্বচ্ছ, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।
মোঃ আমজাদ হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত