কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার সাত ইউনিয়নে থাকা ১২টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সরকারি স্বীকৃতি ও রেজিস্ট্রেশন থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিই এখনো পূর্ণাঙ্গ এমপিওভুক্ত হয়নি। ফলে নিয়মিত বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত শিক্ষকরা বছরের পর বছর বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকারি সহায়তার অভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত উন্নয়নও থমকে আছে। অনেক মাদরাসায় জরাজীর্ণ টিনের ঘর, ভাঙা বেঞ্চ ও অপর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। কোথাও কোথাও বর্ষাকালে শ্রেণিকক্ষে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ায় ব্যাহত হয় পাঠদান। শিক্ষার্থীরাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো নিয়মিত উপবৃত্তি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
স্থানীয়দের উদ্যোগে ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এসব মাদরাসার প্রধান লক্ষ্য ছিল হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের প্রাথমিক ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষা নিশ্চিত করা। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও সরকারি সহায়তার অভাবে বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকার সংকটে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে তাড়াইল উপজেলার ১২টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাকে এমপিওভুক্তি ও জাতীয়করণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৪ জুলাই ২০২৬ কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের সংসদ সদস্য ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের কাছে এসব প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার সুপারিশ করেন।
সুপারিশপত্রে বলা হয়, তাড়াইলের এসব স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা (স্বীকৃতি) অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে শিক্ষকদের জন্য ভাতা চালু হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিও বা নিয়মিত বেতন-ভাতার আওতায় আসেনি।
সুপারিশপত্র অনুযায়ী, তাড়াইলের ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র তিনটি সীমিত ভাতা সুবিধা পাচ্ছে। বাকি নয়টি প্রতিষ্ঠান কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করা অনেক শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) তাড়াইল উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েকটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা সরেজমিনে ঘুরে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
জাওয়ার ইউনিয়নের ছনাটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসার প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে টিনের ঘরে পাঠদান করতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। কখনো কখনো ক্লাসও বন্ধ রাখতে হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেসব সুবিধা পায়, এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তার অনেকটাই পায় না।
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের সব নিয়ম মেনে দীর্ঘদিন ধরে পাঠদান করে আসছি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফাইল কয়েকবার জমা দিয়েছি। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও কার্যকর কোনো সাড়া পাইনি। বেতন-ভাতা না থাকায় অনেক শিক্ষক সংসার চালাতে না পেরে পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।’
বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক ঐক্যফ্রন্টের তাড়াইল উপজেলা শাখার সভাপতি ও রাউতি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসার প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ মোহাম্মদ আবদুস সবুর বলেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক দরিদ্র অভিভাবক সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান একসময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, হাওর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন।
তাড়াইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আহসানুল জাহীদ বলেন, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অধিদপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। সরকার নতুন করে এমপিও দেওয়ার ঘোষণা দিলে তাড়াইলের এসব প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘ চার দশক ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেও সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে দ্রুত নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখতে এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা জরুরি।
তাদের দাবি, শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে তাড়াইলের ১২টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাকে দ্রুত এমপিওভুক্তি বা সরকারি আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা হোক।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত