কিশোর গ্যাং ও মাদক বর্তমান প্রজন্মের জন্য অভিশাপ
অপরাধ দমনে জেলা প্রশাসনের সমন্বিত প্রশাসনিক, আইনি ও সামাজিক উদ্যোগ জরুরি: অ্যাডভোকেট কুতুব উদ্দিন আরিফ
কিশোর গ্যাং ও মাদকাসক্তি বর্তমান প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিশোরদের একটি অংশ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি মাদকের ভয়াল ছোবলে বিপথগামী হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এমন মতামত দিয়েছেন ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অ্যাডভোকেট কুতুব উদ্দিন আরিফ।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক জেলার প্রধান নির্বাহী এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কিশোর গ্যাং ও মাদক অপরাধ প্রতিরোধে প্রশাসনিক, আইনি ও সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে কিশোর অপরাধ দমনে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, অপরাধের কারণ চিহ্নিত করে সংশোধন ও পুনর্বাসনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও আইনগত ব্যবস্থা
কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আইন অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা যেতে পারে। অপরাধের ধরন ও সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিপথগামী কিশোরদের সংশোধনের সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে কিশোরদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের সময় তাদের বয়স, অপরাধের ধরন এবং সংশোধনের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সমাবেশ
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবারকে আরও সক্রিয় করার ওপর গুরুত্বারোপ করে অ্যাডভোকেট কুতুব উদ্দিন আরিফ বলেন, প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা আয়োজন করা যেতে পারে।
এতে সন্তান কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মাদক, বুলিং, সহিংসতা ও গ্যাং কালচারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন করা প্রয়োজন।
খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর তাগিদ
কিশোরদের সুস্থ বিনোদন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত খেলাধুলা, ফুটবল-ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইপড়া ও সামাজিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো হলে কিশোরদের একটি বড় অংশ ইতিবাচক কাজে যুক্ত হতে পারে।
তার মতে, মাঠ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে কিশোরদের দূরে রেখে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কিশোর অপরাধ নির্মূল করা কঠিন।
সন্দেহজনক আড্ডাস্থলে নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান
পার্ক, খেলার মাঠ, পরিত্যক্ত ভবন, বাজারের মোড়, গলি কিংবা অন্যান্য স্থানে কিশোরদের সন্দেহজনক আড্ডা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে কোনো স্থানে কিশোরদের জড়ো হওয়ার বিষয়টি দেখলেই তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে পরিস্থিতি যাচাই, অভিভাবকদের অবহিতকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং জোরদারের পরামর্শ
শিক্ষার্থীদের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি, বুলিং, সহিংসতা কিংবা মাদকাসক্তির কোনো লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক আচরণ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি
স্থানীয় পর্যায়ে কিশোর অপরাধ ও মাদক প্রতিরোধে প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সমাজের মুরব্বি, যুবসমাজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘কিশোর অপরাধ ও মাদক প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে।
এসব কমিটি স্থানীয় এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদকের তৎপরতা সম্পর্কে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিতে পারে। এতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে অপরাধ প্রতিরোধের একটি কার্যকর সামাজিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।
কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যের মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি
কিশোর গ্যাং দমনে শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার বা শাস্তির মধ্যে অভিযান সীমাবদ্ধ না রেখে এর নেপথ্যে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক মদদদাতা, মাদক বিক্রেতা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রকে শনাক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন অ্যাডভোকেট কুতুব উদ্দিন আরিফ।
তিনি বলেন, কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার পেছনে কে বা কারা প্রভাব বিস্তার করছে, কোথা থেকে মাদক বা অর্থ আসছে এবং কোনো বড় অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিপথগামী কিশোরদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ জরুরি
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিপথগামী কিশোরদের ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনমূলক কার্যক্রম, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তার মতে, একটি কিশোরকে অপরাধের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষায়, খেলাধুলায় ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে যুক্ত করতে পারলে শুধু একটি জীবনই রক্ষা হবে না; একটি পরিবার ও সমাজও সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে।
অ্যাডভোকেট কুতুব উদ্দিন আরিফ বলেন, “কিশোর গ্যাং ও মাদক—দুটিই বর্তমান জেনারেশনের জন্য অভিশাপ। এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সচেতন নাগরিকদের একযোগে কাজ করতে হবে। কিশোরদের অপরাধের পথে যাওয়ার আগেই তাদের চিহ্নিত করে সঠিক দিকনির্দেশনা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, কিশোরদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর সামাজিক মূল্য আরও ভয়াবহ হতে পারে।
কুতুব উদ্দিন আরিফ
এডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ফেনী
প্রয়োজনে: ০১৮১৮-৮২৪৭১০

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত