ঢাকা–মাদারীপুর রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
সরকারি ভাড়া ২.৪০ টাকা কিলোমিটার—যাত্রীদের অভিযোগ, ৩৫০–৪০০ টাকার নিচে ভাড়া নেওয়া হয় না
নিজস্ব প্রতিবেদক | জনতার অনলাইন প্রেসক্লাব
ঢাকা–মাদারীপুর সড়কপথে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে বাসভাড়া, যাত্রী ওঠানামা এবং পরিবহন কর্মীদের আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সার্বিক, চন্দ্রা ও সোনালী পরিবহন-এর বিরুদ্ধে যাত্রীদের একটি অংশ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা এবং কর্মীদের রূঢ় আচরণের অভিযোগ তুলেছেন।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সরকার দূরপাল্লার সাধারণ ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করেছে। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বিআরটিএ-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন ভাড়ার হার সাধারণ ডিজেলচালিত বাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; এসি বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না। নতুন হিসাব ৫২ আসনের বড় বাস ও ৩০ আসনের মিনিবাসকে ভিত্তি করে করা হয়েছে; আন্তঃজেলা রুটে আসন কমিয়ে আরামদায়কভাবে পরিচালিত বাসের ক্ষেত্রে হিসাবের বিষয়টিও রয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে সার্বিক, চন্দ্রা ও সোনালী
ঢাকা–মাদারীপুর রুটের যাত্রীদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ৩৫০–৪০০ টাকার নিচে ভাড়া নেওয়া হয় না। অথচ ভাড়ার সরকারি কাঠামো নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। ফলে একজন যাত্রী প্রকৃতপক্ষে কত টাকা দেওয়ার কথা এবং কত টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে—তা অনেক সময় বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর আগে ২০২৩ সালেও ঢাকা–মাদারীপুর রুটে সার্বিক, সোনালী ও চন্দ্রাসহ কয়েকটি পরিবহনের ভাড়া ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা করার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক যাত্রী অসন্তোষের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ও পরিবহন বর্জনের ডাকও দিয়েছিলেন।
এমনকি ২০২৬ সালেও ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ঢাকা–মাদারীপুর রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এক প্রতিবেদনে স্বাভাবিক সময়ের ভাড়া ৩০০ টাকা উল্লেখ করে ঈদে ৫০০–৬০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।
স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামায় ভোগান্তি
যাত্রীদের আরও অভিযোগ, নির্ধারিত স্টপেজের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হয়। এতে একদিকে যাত্রার সময় বাড়ে, অন্যদিকে সড়কে যানজট ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের ক্ষেত্রে চলন্ত বা অনির্ধারিত স্থানে ওঠানামা অতিরিক্ত বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন যাত্রী।
কর্মীদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ
ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন করলে বা টিকিটের মূল্য জানতে চাইলে কোনো কোনো বাসের চালক, হেলপার, সুপারভাইজার ও কাউন্টারকর্মীদের রূঢ় আচরণের শিকার হতে হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।
যাত্রীদের বক্তব্য, একজন যাত্রী তার পরিশোধিত ভাড়ার রসিদ বা টিকিট এবং নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তাকে সম্মানের সঙ্গে তথ্য দেওয়া উচিত। পরিবহন সেবা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি যাত্রী ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সেবামূলক সম্পর্ক।
প্রশ্ন উঠছে—নির্ধারিত ভাড়া কত?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রুটভিত্তিক বিআরটিএ নির্ধারিত সর্বশেষ ভাড়ার তালিকা প্রকাশ্যে থাকা।
২০২২ সালের বিআরটিএর একটি রুটভিত্তিক তালিকায় ঢাকা (সায়েদাবাদ)–মাদারীপুর রুটের দূরত্ব ১১১ কিলোমিটার উল্লেখ ছিল এবং আসনসংখ্যা অনুযায়ী ভাড়া হিসাবের কাঠামোও দেখানো হয়েছিল।
বর্তমানে যেহেতু দূরপাল্লার সাধারণ ডিজেল বাসের কিলোমিটারপ্রতি হার ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে, তাই ঢাকা–মাদারীপুর রুটের ৪০ ও ৫১ আসনের বাসের ক্ষেত্রে বিআরটিএর সর্বশেষ রুটভিত্তিক অনুমোদিত ভাড়া কত—তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা জরুরি।
যাত্রীদের ৫টি প্রশ্ন
১. ঢাকা–মাদারীপুর রুটে ৪০ ও ৫১ আসনের নন-এসি ডিজেল বাসের সর্বশেষ সরকারি অনুমোদিত ভাড়া কত?
২. প্রতিটি বাসের কাউন্টারে সরকারি ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমানভাবে টাঙানো আছে কি?
৩. ৩৫০–৪০০ টাকা বা তার বেশি ভাড়া নেওয়া হলে তার ভিত্তি কী?
৪. নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানো-নামানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা কী?
৫. যাত্রীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণের অভিযোগের বিষয়ে পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন?
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে বিআরটিএ, মাদারীপুর সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানিগুলোর বক্তব্য প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, সরকারি ভাড়ার তালিকা এবং বাস্তবে আদায়কৃত ভাড়ার টিকিট—সবকিছু যাচাই করেই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন করা উচিত।
যাত্রীস্বার্থে কার্যকর নজরদারি জরুরি
ঢাকা–মাদারীপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃজেলা যোগাযোগ রুট। এই রুটের যাত্রীদের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত ভাড়া মনিটরিং, কাউন্টারে অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন, টিকিট প্রদান নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
যাত্রী যেন নির্ধারিত ভাড়া দিয়ে নিরাপদে, স্বাচ্ছন্দ্যে এবং সম্মানের সঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন—এটাই হওয়া উচিত গণপরিবহন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ সত্য না হলে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার বিষয়টি জনসাধারণের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা—দুই ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।
জনস্বার্থে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত