তিস্তার উত্তাল স্রোতে ভেসে যাওয়া হাতির ছানাকে জীবনদান:
আমজাদ হোসেন মিঠু,
বিশেষ প্রতিনিধি:
বিপদগ্রস্ত প্রাণকে পরম যত্নে আঁকড়ে ধরে রাখার মানুষের এই অকৃত্রিম মায়াতেই পৃথিবীটা আজও সুন্দর। তিস্তা নদীর উত্তাল স্রোতে ভেসে যাওয়া তিন-চার দিনের এক নিঃসহায় হাতির ছানাকে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করেছেন স্থানীয় পাঁচ জেলে। পরবর্তীতে বন বিভাগের সহায়তায় চার ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষে ছানাটিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে তার মায়ের কোলে।
ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবা ব্যারেজ সংলগ্ন তিস্তা নদীতে। মানবতা ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্কের এই অনন্য দৃশ্য ইতোমধ্যে নাড়া দিয়েছে বহু মানুষের হৃদয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর সকালে গজলডোবা ব্যারেজের কাছে হাতির একটি পাল নদী পার হচ্ছিল। এ সময় নদীর তীব্র স্রোতে পাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেসে যায় তিন-চার দিনের এক সদ্যজাত হাতির ছানা। স্রোতের টানে প্রায় চার কিলোমিটার ভাটিতে ভেসে গিয়ে পানির ওপর কেবল শুঁড় তুলে টিকে থাকার আকুল চেষ্টা করছিল অবলা প্রাণীটি।
ঠিক সেই মুহূর্তে নদীতে মাছ ধরছিলেন স্থানীয় পাঁচ জেলে। পানির ওপর ছোট্ট শুঁড়টি দেখতে পেয়েই তাঁরা অনুধাবন করেন—দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ছানাটি ডুবে প্রাণ হারাবে। নিজেদের নিরাপত্তার পরোয়া না করে তাঁরা উত্তাল স্রোতের বিরুদ্ধে নৌকা চালিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ছানাটির কাছে পৌঁছান। এরপর কয়েকজন জেলে সরাসরি পানিতে নেমে পরম যত্নে হাতির ছানাটিকে নৌকায় তুলে আনেন এবং দ্রুত বন বিভাগের কর্মীদের খবর দিয়ে তাদের হাতে হস্তান্তর করেন।
তবে উদ্ধার পর্ব শেষ হলেও আসল চ্যালেঞ্জ ছিল ছানাটিকে তার জন্মদাত্রী মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। বনকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় শুরু হয় সন্ধান অভিযান। প্রায় দুই ঘণ্টার নিবিড় অনুসন্ধানের পর নদীর তীরবর্তী বনাঞ্চলে মা হাতিটির সন্ধান মেলে।
বনকর্মীরা ছানাটিকে কাছে নিয়ে গেলে মা হাতিটি এগিয়ে এসে নিজের সন্তানকে বুকে টেনে নেয়। দীর্ঘ সময় পর ছানাটি তার মায়ের দুধ পান করে এবং একপর্যায়ে মা ও ছানা নিরাপদে বনের গভীরে নিজেদের দলের সঙ্গে মিশে যায়।
নিষ্ঠুরতা ও হানাহানির নানা সংবাদের ভিড়ে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই ভালোবাসার গল্প যেন এক আলোর দিশা। জেলেদের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ আর বনকর্মীদের দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করে—ভাষার দেয়াল থাকলেও বিপদের মুহূর্তে মায়াই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাষা।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত