শিক্ষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতির পাদপীঠ কুষ্টিয়া জেলা বঙ্গভূমির এক অনন্য জনপদ। গঙ্গা ও গড়াই নদীর পলিবিধৌত এই অঞ্চল কেবল লালন ফকিরের সাধনা কিংবা রবীন্দ্রনাথের কাব্যচর্চার ক্ষেত্র নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন শিল্পায়ন ও আধুনিক রেলযোগাযোগেরও অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তবে এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনাকে পর্যটনবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
কুষ্টিয়ার জন্মকথা ও নামকরণের ইতিহাস
কুষ্টিয়া জেলার ভূখণ্ড প্রাচীনকালে বঙ্গ বা রাঢ় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইংরেজ শাসনামলে এটি প্রথমে নদীয়া জেলার অধীনে একটি মহকুমা ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর নদীয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কুষ্টিয়া একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তৎকালীন সময়ে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা এর মহকুমা হিসেবে যুক্ত থাকে। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে কুষ্টিয়া বর্তমান সীমানায় রূপ নেয়।
'কুষ্টিয়া' নামের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিকদের মধ্যে নানাবিধ মত প্রচলিত রয়েছে:
* 'কুষ্টি' থেকে উৎপত্তি: স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত, এই অঞ্চলে একসময় প্রচুর 'কুষ্টি' বা পাট উৎপন্ন হতো। পাট কেনাবেচার বড় কেন্দ্র বা গঞ্জ হিসেবে স্থানটির নাম হয় কুষ্টিয়া।
* কোষ্ঠী বা কুষ্টি: কুষ্টিয়ার বিখ্যাত রেশম বস্ত্র ও তাঁতশিল্পের 'কোষ্ঠী' শব্দ থেকেও এই নামের উৎপত্তি হতে পারে বলে অনেক গবেষক মনে করেন।
* ফার্সি শব্দ: ফার্সি ভাষায় 'কুশত' বা 'কুশতে' শব্দের অর্থ নদী বা খালের পাড়। গড়াই নদীর তীরবর্তী বাজার হিসেবে ফার্সি বণিকদের মাধ্যমে এই নাম বিস্তৃত হতে পারে।
উপমহাদেশের শিল্প ও আধুনিকতার পথিকৃৎ
কুষ্টিয়ার ইতিহাস আধুনিক শিল্পায়ন ও নগর বিকাশের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুটি ঐতিহাসিক স্থাপনা কুষ্টিয়াকে ভারত উপমহাদেশের আধুনিকায়নের মানচিত্রে বিশেষ স্থান দিয়েছে:
* জগতি রেলওয়ে স্টেশন (বাংলাদেশের প্রথম রেলওয়ে স্টেশন): ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ববঙ্গে প্রথম রেলপথ চালু হয় কলকাতা থেকে কুষ্টিয়ার 'জগতি' পর্যন্ত। সেই সুবাদে জগতি রেলওয়ে স্টেশনটি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম রেলওয়ে স্টেশন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়।
* মোহিনী মিলস: ১৯০৮ সালে খাতাউ মোহিনী মোহন শর্মা কুষ্টিয়া শহরে স্থাপন করেন ঐতিহাসিক 'মোহিনী মিলস'। একসময় এটি ছিল সমগ্র এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সুতা ও কাপড় তৈরির কারখানা। কুষ্টিয়া শহরকে একটি শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে মোহিনী মিলের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রসমূহ
কুষ্টিয়া জেলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিশ্বমানের প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য:
* শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই কুঠিবাড়িতে বসে কবিগুরু তাঁর অমর সৃষ্টি 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের একাংশসহ বহু ছোটগল্প ও কবিতা রচনা করেন। পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ভবনটি বর্তমানে একটি অন্যতম সংরক্ষিত জাদুঘর।
* ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়ি: বাউল সম্রাট সাঁইজি লালন শাহের মাজার ও আশ্রম কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত। আত্মদর্শন ও মানবতাবাদী দর্শনের এই কেন্দ্রে প্রতিবছর দোল উৎসব ও কার্তিক মাসে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি ভক্ত ও পর্যটকের সমাগম ঘটে।
* মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা: কালজয়ী উপন্যাস 'বিষাদ সিন্ধু'র রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতি বিজড়িত বাস্তুভিটা কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ায় অবস্থিত, যা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এক পবিত্র তীর্থস্থান।
* অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শন: এছাড়াও লালন শাহ সেতু, শিলাইদহের গড়াই নদী তীরবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রাচীন ঝাউদিয়া মসজিদ ও তড়িয়া নীলকুঠি জেলাটির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
সমস্যা ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
এত ঐতিহ্য আর অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত সংরক্ষণ ও আধুনিক পর্যটনবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে কুষ্টিয়া তার সঠিক পর্যটন মর্যাদা পাচ্ছে না। ঐতিহাসিক জগতি রেলওয়ে স্টেশন এবং মোহিনী মিলসের স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ অবহেলায় বিলীন হওয়ার পথে।
কুষ্টিয়াকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা সম্ভব। শিলাইদহ, ছেঁউড়িয়া ও লাহিনীপাড়াকে যুক্ত করে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করা, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-মোটেল নির্মাণ, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ এবং প্রচার জোরদার করা গেলে কুষ্টিয়া হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজস্ব উৎপাদনকারী পর্যটন অঞ্চল।
ইতিহাস, শিল্প ও সাহিত্যের মিলনমেলা এই কুষ্টিয়াকে আগামী প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬

মতামত