বিএনপি সরকারে শরিকদের মূল্যায়ন: রাজপথের ঐক্য থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারত্ব
আমজাদ হোসেন মিঠু,
বিশেষ প্রতিনিধি।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ৬ মাস পূর্তিতে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ ও রদবদলের মাধ্যমে জোট ও রাজনৈতিক মিত্রদের অবস্থান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকার গঠনের শুরুতে শরিকদের প্রতিনিধিত্ব লক্ষণীয় হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্তি এই রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত ২১ আগস্ট রাতে শপথ নেওয়ার পরদিন তাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের আন্দোলনের রাজনৈতিক মিত্রদের মূল্যায়ন এবং ‘জাতীয় সরকার’ ধারণার একটি সীমিত বাস্তব রূপ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি দিয়েছিল, শুরু থেকেই মন্ত্রিসভায় তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতায় ফিরে শরিক ও যুগপৎ আন্দোলনের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বিএনপি তাদের রাজপথের ঐক্যের বার্তা রাষ্ট্র পরিচালনায় পৌঁছে দিল।
বিজয়ী ৫ জনের ৪ জনই সরকারে
চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শরিকদের জন্য ১৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। নির্বাচনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর পাঁচজন নেতা বিজয়ী হন। এর মধ্যে চারজনই স্থান পেয়েছেন সরকারে:
আন্দালিব রহমান পার্থ (বিজেপি):তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী (ভোলা-১)।
জোনায়েদ সাকি (গণসংহতি আন্দোলন):পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
মো. নুরুল হক নূর (গণঅধিকার পরিষদ): প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী।
ববি হাজ্জাজ (এনডিএম): প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।
একমাত্র বিজয়ী শরিক নেতা হিসেবে এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম মন্ত্রিসভার বাইরে রয়েছেন। এছাড়া পার্থকে প্রথমে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান করা হলেও এবার তাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হলো।
মন্ত্রিসভার আকার এখন ৫২
রদবদলের এই দফায় শরিকদের পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, বান্দরবানের সাচিং প্রু জেরী এবং প্রতিমন্ত্রী থেকে প্রমোশন পেয়ে পূর্ণমন্ত্রী হওয়া রশিদুজ্জামান মিল্লাত মন্ত্রিসভায় নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। শামীম কায়সার লিংকন (ধর্ম) ও হুমায়ুন কবির (পররাষ্ট্র) নতুন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। এর ফলে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শপথ নেওয়া ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভার আকার বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে।
পার্থকে ঘিরে আলাদা রাজনৈতিক বার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির বাইরে থাকা শরিক দলের নেতাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মতো স্পর্শকাতর দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৮ সাল থেকেই বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে ভোলা-১ আসন থেকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন পার্থ। এই দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে শরিকদের ওপর বিএনপি সরকারের গভীর আস্থার একটি দৃশ্যমান বার্তা প্রকাশ পেয়েছে।
ভারসাম্য নাকি কৃতজ্ঞতা?
শরিকদের জায়গা দিলেও সরকারের মূল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিএনপির হাতেই রয়েছে। মন্ত্রিসভায় বিএনপির অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি বড় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে নতুন মুখ। ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সবাই প্রথমবারের মতো দায়িত্ব পেয়েছেন।
তবে সব মিত্র এই মূল্যায়নের আওতায় আসেননি। রাজপথের যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় থাকা নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হকসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের মন্ত্রিসভায় দেখা যায়নি।
সামনে আসল পরীক্ষা
শরিকদের কেবল পদ দেওয়া পর্যন্তই রাজনৈতিক সাফল্য সীমাবদ্ধ থাকছে না; নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তারা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অর্থ, পরিকল্পনা, শিক্ষা ও প্রবাসীকল্যাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে শরিক প্রতিমন্ত্রীদের পারফরম্যান্স তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।
রাজপথের মিত্রদের রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করে বিএনপি যে নতুন অংশীদারত্বের সূচনা করল, তা কেবল পদবণ্টনেই আটকে থাকে নাকি জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলে—আগামী দিনের রাজনীতিতে সেটিই হবে দেখার বিষয়।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত