আজ ১ সেপ্টেম্বর, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চার তারকা জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী (এম এ জি ওসমানী)-এর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রণকৌশল নির্ধারণ এবং মুক্তিবাহিনী গঠনে তার অসামান্য অবদানের জন্য জাতি তাকে আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে।
সংবাদ বা নিউজ তৈরির উপযোগী করে তার জীবন ও কর্মের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে উপস্থাপন করা হলো:
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
জন্ম: ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন আসামের (বর্তমানে বাংলাদেশের) সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান সেখানে মহকুমা হাকিম (এসডিও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পৈতৃক নিবাস: তাঁর মূল পৈতৃক বাড়ি সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার (বর্তমান ওসমানীনগর উপজেলা) দয়ামীর গ্রামে।
বংশমর্যাদা: তিনি বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (র.)-এর অন্যতম সঙ্গী শাহ নিজামুদ্দিন ওসমানীর বংশধর ছিলেন।
শিক্ষাজীবন ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগাদান
ম্যাট্রিকুলেশন: ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারি পাইলট হাই স্কুল থেকে অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং ইংরেজিতে মেধার জন্য 'প্রিটোরিয়া পুরস্কার' লাভ করেন।
উচ্চশিক্ষা: ১৯৩৮ সালে ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল বিষয়ে স্নাতক (গ্র্যাজুয়েশন) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
সামরিক জীবন শুরু: ১৯৩৯ সালে তিনি রয়্যাল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ 'মেজর' পদে উন্নীত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি বার্মা (মিয়ানমার) সীমান্তে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
দেশভাগ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী: ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
বাঙালি সেনাদল গঠন: ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠায় এবং বাঙালিদের সামরিক বাহিনীতে সম্পৃক্ত করতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে 'কর্নেল' হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও প্রধান সেনাপতি
মুজিবনগর সরকার গঠন: ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার (মুজিবনগর সরকার) গঠিত হলে ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (কমান্ডার-ইন-চিফ) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
১১টি সেক্টর ও রণকৌশল: তাঁর সুদক্ষ পরিকল্পনা ও যুদ্ধকৌশলের ওপর ভিত্তি করেই সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। নিয়মিত সামরিক বাহিনী ও সাধারণ মানুষকে (মুক্তিবাহিনী) একত্রিত করে তিনি গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করেন।
প্রথম জেনারেল: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে 'জেনারেল' পদে উন্নীত করে এবং তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।
রাজনৈতিক জীবন ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব
রাজনীতি ও মন্ত্রিত্ব: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে এমএনএ (সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় নৌ-যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান চলাচল মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাকশালের বিরোধিতা ও পদত্যাগ: ১৯৭৫ সালে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করে তিনি নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে সংসদ সদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
জীবনাবসান ও খেতাব
উপাধি: বাঙালিদের অধিকার আদায় এবং মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বের জন্য দেশবাসী তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসে 'বঙ্গবীর' উপাধিতে ভূষিত করে।
মৃত্যু: ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত