আশুলিয়ার চারিগ্রামে ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার, নেপথ্যে কারা?
ঢাকার আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের চারিগ্রাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দুই পেশাদার মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- ঢাকার আশুলিয়ার চারিগ্রাম এলাকার চুন্নু মিয়ার ছেলে মেহেদি হাসান রুপা (৩৬) এবং পাবনার বেড়া থানার হাটুরিয়া এলাকার বাসিন্দা, বর্তমানে আশুলিয়ার বটতলা এলাকায় বসবাসকারী মো. টি আলম ওরফে গামা (৩৫)।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের 'ক' সার্কেলের উপপরিদর্শক (এসআই) জেরিন সুলতানা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা 'ক' সার্কেলের একটি বিশেষ দল চারিগ্রাম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের একপর্যায়ে মেহেদি হাসান রুপার নিজ বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে ২০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। পরে ইয়াবাসহ রুপা ও টি আলম ওরফে গামাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক জেরিন সুলতানা বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চারিগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং বিভিন্ন মাদকবিরোধী উদ্যোগ চললেও এলাকায় মাদকের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ জুলাই চারিগ্রাম এলাকায় স্থানীয়দের উদ্যোগে মাদকবিরোধী কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ওই কর্মসূচির পরও একই এলাকায় ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মাদক নিয়ন্ত্রণে চলমান কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
তাদের প্রশ্ন, শুধু মাদক বহনকারী কিংবা খুচরা পর্যায়ের কারবারিদের গ্রেপ্তার করলেই কি একটি এলাকার মাদক সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব? নাকি মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, পৃষ্ঠপোষক, অর্থের উৎস এবং পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগে মেহেদি হাসান রুপার বড় ভাই রবিউল এর নামও উঠে এসেছে। তাদের দাবি, চারিগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় ইয়াবা সরবরাহের সঙ্গে রবিউলের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে রবিউলের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, এলাকায় মাদক কারবারিদের পেছনে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আশুলিয়া থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক লোকমান শেখের নামও স্থানীয়দের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তির সঙ্গে লোকমান শেখের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এবং তার প্রভাবের কারণে তারা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার চালিয়ে আসছিলেন। তবে লোকমান শেখের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, একটি এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু ইয়াবা উদ্ধার এবং কয়েকজন কারবারিকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। মাদকের উৎস কোথায়, কার মাধ্যমে চালান আসে, কারা সরবরাহ করে, কোথায় মজুত রাখা হয় এবং অর্থের লেনদেন কীভাবে হয়- এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষ করে কোনো এলাকায় বারবার মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং মাদকের পুরো সরবরাহ চেইন অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক জেরিন সুলতানা জানান, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আশুলিয়াসহ ঢাকা জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে চারিগ্রামের সর্বশেষ অভিযানে ২০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের পর স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই ইয়াবা কোথা থেকে এলো, কার মাধ্যমে এলাকায় পৌঁছাল এবং এর সরবরাহের নেপথ্যে আর কারা জড়িত?
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, গ্রেপ্তার দুজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্তে শুধু উদ্ধার হওয়া ইয়াবার উৎস নয়, এর সঙ্গে জড়িত পুরো সরবরাহ চেইন, সহযোগী ও অর্থের উৎসও খতিয়ে দেখা উচিত।
আশুলিয়ার চারিগ্রাম, কুরগাঁও ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিস্তারের যে অভিযোগ রয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র বের করতে হলে খুচরা কারবারিদের পাশাপাশি মাদকের উৎস, সরবরাহকারী ও নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত